সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্ষমতাসীন দলের এই এমপির বিরুদ্ধে বেআইনি ক্যাসিনো ব্যবসা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগটির অনুসন্ধান গত বছরের প্রথম দিকে শুরু হলেও তা এখন ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে অভিযোগটির অনুসন্ধানে বেশ গতি ছিল। হঠাৎ করেই আগের কমিশন অভিযোগটির অনুসন্ধানের তৎপরতা স্তিমিত করার নির্দেশনা দেয়। এমপি রতনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির আমলযোগ্য তথ্যপ্রমাণ থাকার পরও এরপর থেকে অনুসন্ধানের গতি মন্থর হয়ে যায়। অভিযোগটির অনুসন্ধান করছিলেন ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী।

জানা গেছে, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরও অভিযোগটির অনুসন্ধানে গতি পায়নি, আগের নীতিই বহাল রয়েছে। তবে গত বছরের শুরুতে তাকে অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এমপি রতন ও তার স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতার ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় নথি ও তথ্য চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের প্রথম দিকে এমপি রতন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগটির অনুসন্ধান চলাকালে হঠাৎ করেই গতি থামাতে নির্দেশ দেয় কমিশন। এ নির্দেশনার পর পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট অনুবিভাগ ও অনুসন্ধান কর্মকর্তার আর কোনো করণীয় থাকে না। সে কারণেই অভিযোগটির ফাইলটি বর্তমানে ফিতাবন্দি হয়ে আছে।

এমপি রতনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সরকারি সম্পত্তি বেদখল, এলাকার মানুষের সম্পদ লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান করছিল দুদক। ওই সময় প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার নামে-বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। গত বছরের মাঝামাঝিতে দুদকের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এমপি রতনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছে।

ওই সব অভিযোগ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি। দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে ক্যাসিনোবিরোধী বিশেষ টিমের সদস্যরা তাকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার কাছে পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছিল, ঠিকাদার জি কে শামীমসহ অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে অবৈধ প্রক্রিয়ায় পরস্পর যোগসাজশে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে বড় বড় ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বেআইনি ক্যাসিনো ব্যবসা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্জন করে বিদেশে পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সূত্র জানায়, নির্বাচনী এলাকায় অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন এবং কয়লা আমদানিকারক সমিতি, বিভিন্ন মার্কেট, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ তিনি স্ত্রীর নামে রেখেছেন।

এমপি রতনের বিরুদ্ধে দুদকে পেশ করা অভিযোগে বলা হয়, তার নামে ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে ১৩টি বাড়ি রয়েছে। নিজ গ্রাম ধর্মপাশায় ১০ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করেছেন ‘হাওর বাংলা’ নামে বিলাসবহুল বাড়ি। সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইন্সের বিপরীতে সাত কোটি টাকায় ‘পায়েল পিউ’ নামের বাড়ি কিনেছেন।

ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও সাতটি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি। নেত্রকোনা জেলা শহরেও একটি বাড়ি রয়েছে। নেত্রকোনা শহরে মা-বাবার নামে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকায় জমি কিনেছেন। ঢাকার গুলশানের নিকেতনে তার নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। তার ভাই যতন মিয়ার নামে কেনা হয়েছে ৫০০ একর জমি। এ ছাড়া তার নামে-বেনামে রয়েছে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে


সূত্র : সমকাল