গত বছরের অক্টোবর মাসে তিন ইস্যুতে উত্তাল ছিলো সিলেট। প্রায় প্রতিদিনই স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হতো নগরীর বিভিন্ন পথ, উপজেলা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রাবাসে তরুণীকে গণধর্ষণ, রায়হান হত্যার ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইসলামের নবীর কার্টুন দেখানের পক্ষে সাফাই গাওয়া নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে প্রতিদিনই মিছিল-বিক্ষোভ হতো নগরীসহ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে।

এ বছরের অক্টোবরও যেন উত্তপ্ত হয়েই ফিরলো সিলেটে। গত দুদিন ধরে সিলেটে একের পর এক ঘটছে উত্তেজনাকর ঘটনা। তবে সম্ভাব্য সকল প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী।

জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে বিলম্বের প্রায় ৪ বছর পর মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। সিলেট জেলা ছাত্রলীগের নতুন সভাপতি করা হয় মো. নাজমুল ইসলামকে ও সাধারণ সম্পাদক করা রাহেল সিরাজকে। অপরদিকে, সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রা হয় কিশোয়ার জাহান সৌরভকে ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় নাঈম হাসানকে।

কমিটির দায়িত্বশীলদের নাম ঘোষণার পর সভাপতির পদ পাওয়া দুটি বলয়ে উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও ক্ষোভ দেখা দেয় সিলেট ছাত্রলীগের অন্য বলয়গুলোতে। ফলে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সিলেট ছাত্রলীগে। টাকার বিনিময়ে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটির সভাপতি শাহারিয়ার আলম সামাদ। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় তেলিহাওর থেকে তার নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নগরীর জিন্দাবাজার আল-হামরা মার্কেটের সামনে আসলে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়। পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি সামনে অগ্রসর হয়। চৌহাট্টা পয়েন্টে গিয়ে বিক্ষোভকারী নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। কিছু সময় সড়ক অবরোধ শেষে ফিরে যান তারা।

অপরদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মহানগর কমিটিকেও প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ মিছিল ও সভা করেন নেতাকর্মীদের একাংশ। বিকাল সাড়ে ৫টায় মহানগর ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী অংশ’ নগরীর চৌহাট্টা এলাকার সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে সেটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌহাট্টা পয়েন্টে এসে এক সভায় মিলিত হয়।

এই দুই বিক্ষোভের পরপরই সিলেট জেলা ছাত্রলীগের নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের বাসায় হামলার অভিযোগ ওঠে। কমিটির জের ধরে ছাত্রলীগের তেলিহাওর গ্রুপের সাবেক ও বর্তমান একদল নেতাকর্মী এই হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেন রাহেল সিরাজের ভাই গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রুমেল সিরাজ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর আম্বরখানা বড়বাজারস্থ রাহেল সিরাজের বাসায় এই হামলার ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীতে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে রাস্তায় টানা আন্দোলন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের বিদ্রোহী অংশের নেতৃত্ব দান কারী সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ। এ পরিস্থিতিতে সিলেটে আজ অস্থীতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

এদিকে, ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব-উত্তেজনা শেষ না হতেই ধর্মীয় ইস্যুতে উত্তাল হয়ে পড়েছে নগরীসহ সিলেটের বিভিন্ন এলাকা। বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট কোর্ট পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কুমিল্লায় 'কুরআন অবমাননার' ঘটনা বা গুজবে এমনটি ঘটছে।

জানা গেছে, বুধবার (১৩ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘীর উত্তরপাড়স্থ পূজা মণ্ডপে প্রতিমার পায়ের ওপর পবিত্র কুরআন রেখে অবমাননার একটি ছবি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে তারাও তোপের মুখে পড়ে, বাঁধে সংঘর্ষ। এরপর দুপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

এদিকে, কুমিল্লায় পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত থাকলেও এর জের ধরে সিলেটের জকিগঞ্জে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ জনতার মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ইউএনও, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ওসি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের গাড়ি। ঘটনাটি বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারে ঘটেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়ে। সংঘর্ষে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মস্তুফা উদ্দিন ও পুলিশ-জনতাসহ ৩৫-৪০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে র‌্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় ও পুরিশ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে এর প্রতিবাদে কালিগঞ্জে সন্ধ্যার পরে মাইকিং করা হয় এবং এশার নামাজের পর বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল বের করেন। মিছিল শুরু করেই দায়িত্বরত পুলিশের উপর চড়াও হয় মিছিলকারীরা। এরপর মিছিলটি মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নিজস্ব গাড়ি রাখা দেখতে পেয়ে এসব গাড়িতে হামলা ওভাঙচুর চালান মিছিলকারীরা।

এসময় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমী আক্তার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন, ওসি আবুল কাসেম ইউনিয়ন পরিষদের ভিতরে অবস্থান করায় হামলাকারীদের কবল থেকে রক্ষা পান।

অপরদিকে, ‘সিলেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামক সংগঠনের ব্যানারে একই ইস্যুতে সিলেট নগরীতে মিছিল ও বিক্ষোভ সভা করেছেন তাওহিদি জনতা। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর কোর্ট পয়েন্টে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তারা বলেন, আমাদের এ প্রতিবাদ কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। আমরা চাই- ঘটনা খতিয়ে দেখা এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম হাজিফ কামাল উদ্দিন।

এছাড়াও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগামী শুক্রবার বাদ জুম্মা সিলেট বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল বের করা হবে। উলামা পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতি শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।

সব মিলিয়ে সিলেটে যেন ফিরে এসেছে গত বছরের ‘উত্তপ্ত অক্টোবর’

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম