সিলেট নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ (৩৪) হত্যা মামলার অন্যতম আসামি পলাতক আব্দুল্লাহ আল নোমান সম্পর্কে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। রায়হান হত্যাকাণ্ডের মূল আলামত সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ গায়েবে সহযোগী কোম্পানীগঞ্জের নোমানের বর্তমান অবস্থানও জানা গেছে।

জানা গেছে, নোমান ৭/৮টি দেশ ঘুরে এখন ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে অবস্থান করছেন। তিনি ফ্রান্সের প্যারিস শহর থেকে প্রায় ২শ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রাম এলাকায় গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তিনি যেখানে কম বাংলাদেশি থাকেন এমন এলাকা বেছে নিয়েছেন। নোমান ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।


সিলেট ভিউ'র খবর নিয়মিত পেতে

দিয়ে যুক্ত থাকুন

রোববার (৫ ডিসেম্বর) বিকেলে নোমানের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এসময় নোমান জানান, ঘটনার দিন বরখাস্তকৃত এসআই আকবর তাকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন। আকবর তখন নোমানকে বলেছিলেন-কম্পিউটারের একটি হার্ডডিক্স লাগবে। নোমান তখন মিজান নামের একজন কম্পিউটারের টেকনিশিয়ান নিয়ে হার্ডডিক্সসহ কোতোয়ালি থানার সামনে আকবরের সাথে দেখা করেন। এরপর মিজান পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে দেখতে পান কম্পিউটারের হার্ডডিক্স নয়, ডিভিআরের হার্ডডিক্স বদলাতে হবে। এরপর মিজান তার পরিচিত সিসি ক্যামেরার একজন টেকনিশিয়ানকে ফোন করে ফাঁড়িতে আনেন। কাজ শেষে এসআই আকবর তখন দুই টেকনিশিয়ানকে টাকাও দিয়েছেন।

নোমানের দাবি- তিনি তখন বন্দরবাজার এলাকার কুদরত উল্লাহ মার্কেটের সামনে চা খাচ্ছিলেন। সিসিটিভির ফুটেজ ধারণকৃত হার্ডডিক্স কার কাছে ছিলো- এমন প্রশ্নের জবাবে নোমান বলেন, এটি এসআই আকবরের কাছে ছিল এবং পরবর্তীতে আকবর হার্ডডিক্সটি নদীতে ফেলে দিয়েছেন।

নোমান বলেন, আকবর যখর ভারতে পালিয়ে যান তখন তিনি দেশেই ছিলেন। রায়হান হত্যাকা-ের ঘটনার পর প্রায় তিনমাস নোমান রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি এমন একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করতেন- যেটি সহজে প্রশাসনের জন্য ট্র্যাকিং করা সম্ভব ছিল না। তিনি দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকাও তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছি।’ ওই সকল ব্যাংকের সিসিটিভির ফুটেজে তাকে দেখা যাবে বলেও দাবি তার।

কীভাবে ফ্রান্সে গেলেন? এমন প্রশ্ন করলে নোমান জানান, আকবর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি দিনাজপুর হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেই দেশে তিনি ৭৫ হাজার রুপি দিয়ে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট তৈরি করেন। ভারত থেকে ৩/৪টি দেশ ঘুরে সার্ভিয়া যান। সার্ভিয়া থেকে সড়ক পথে রোমানিয়া হয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করেন। নোমান জানান, ফ্রান্সে প্রবেশ করা পর্যন্ত তিনি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। তার বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনরা তাকে আর্থিকভাবে অনেক সহযোগিতা করেছেন। নোমানের সাথে আলাপচারিতার ১০ মিনিটের অডিও রেকর্ড সিলেটভিউ২৪-এর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

রায়হান হত্যার ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ফুটেজ গায়েবের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। সেই সাথে স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান ওই ফুটেজ গায়েবের সাথে জড়িত ছিলেন বলে জানতে পারে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ মামলার প্রধান আসামি আকবরসহ ৫ জন গ্রেপ্তার হলেও লাপাত্তা হয়ে যান নোমান।

পিবিআইর দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট নগরীর একটি কম্পিউটার দোকান থেকে নতুন হার্ডডিস্ক কিনে ফুটেজ ধারণকৃত পুরনো হার্ডডিস্কটি মূল অভিযুক্ত ও বরখাস্ত এসআই আকবর, এসআই হাসান ও নোমান মিলে গায়েব করেন। এতে লোপাট হয়ে যায় নির্যাতনের প্রমাণ।

নোমান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বুরিডহর গ্রামের মো. ইছরাইল আলীর ছেলে। তার বাবা কোম্পানীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক। আর মা মোছা. বিলকিস আক্তার উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনস্থ কোম্পানীগঞ্জের স্বাস্থ্যকর্মী।

সূত্রমতে, গত বছর ১২ অক্টোবর নোমান তার ফেসবুক আইডিও ডিঅ্যাক্টিভ করে ফেলেন। ফলে নোমান কোথায় আছে সেটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন। তবে নোমানকে গ্রেপ্তার করতে নোমানের বাড়িসহ তার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবুও চতুর নোমানকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। শুধু অভিযানই নয়- নোমানের হদিস পেতে তার বাবা ইসরাইল আলীকেও কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে, অপর আরেকটি সূত্র জানায়- নোমান এখন ফ্রান্সেই আছেন। সে দেশের প্যারিস শহরের একটি গ্রামে অবস্থান করছেন। নোমান এর আগে ভারত থেকে একটি দেশে যান। সেখান থেকে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে প্রবেশ করেন। তবে নোমান কোথায় রয়েছে এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দোটানার মধ্যে রয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ জানান, আলোচিত এ মামলার তদন্ত করেছে পিবিআই। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। নোমান কোথায় আছে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সে কোন দেশে আছে তার এখনও কোনো সঠিক তথ্য আমাদের জানা নেই। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এনসিবি ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে নোমানকে সেই দেশের প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর পুলিশ সুপার খালেদ-উজ-জামান সিলেটভিউ-কে বলেন, রায়হান হত্যা মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে আব্দুল্লাহ আল নোমানকে পলাতক দেখানো হয়েছে। বর্তমানে সে কোথায় আছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তথ্য আমাদের কাছে নেই।

তিনি বলেন, আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি তার সম্পত্তি ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছেন। নোমান কোন দেশে আছে-এর সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা তাকে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলোচিত এ মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত এক হাজার ৯শ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন চার্জশিট গ্রহণ করেন এবং এ সময় মামলার পলাতক আসামি আব্দুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

এর আগে গত বছরের ১০ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে সিলেট শহরের আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে সকালে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি সেখানে মারা যান। পরদিন তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলাটির তদন্তে প্রথমে পুলিশ ছিল। পরে সে বছরের ১৩ অক্টোবর মামলাটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। চলতি বছরের ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ছয়জনের বিরুদ্ধে দাখিল করা চার্জশিটে পাঁচজনই পুলিশ সদস্য।

তারা হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটুচন্দ্র দাস ও হারুনুর রশিদ। অভিযুক্ত অপরজন পলাতক আব্দুল্লাহ আল নোমান।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / শিপু / ডালিম