দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) শুরু হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ কিংবা যাতায়াত করেননি এমন মানুষও এ ধরনটিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওমিক্রন শনাক্ত ৩৩ রোগীর মধ্যে ২৪ জনেরই অন্য দেশে যাওয়ার ইতিহাস নেই। পাশাপাশি সংক্রমণ ঢাকার বাইরেও শুরু হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার যশোরে তিনজনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে যাতায়াতের ইতিহাস না থাকা এবং ঢাকার বাইরে রোগী শনাক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে।


সিলেট ভিউ'র খবর নিয়মিত পেতে

দিয়ে যুক্ত থাকুন

গত ৯ ডিসেম্বর জিম্বাবুয়ে ফেরত নারী ক্রিকেট দলের দুই সদস্যের শরীরে প্রথম ওমিক্রন শনাক্ত হয়। এর ১৪ দিনের মাথায় ২৩ ডিসেম্বর একজনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত হয়। তিনি বিদেশফেরত ছিলেন। তারপর ২৮ ডিসেম্বর শনাক্ত হওয়া চারজনও বিদেশ থেকে ফিরেছিলেন। এরপর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত আরও ২৬ জনের ওমিক্রন শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে ২ জন ছাড়া কারও বিদেশে যাতায়াতের ইতিহাস মেলেনি।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, বর্তমানে সংক্রমিত রোগীর ৮০ শতাংশই রাজধানীর বাসিন্দা। অর্থাৎ ঢাকায় সংক্রমণ বেশি।

তবে এখন দেশে কোন ধরন বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে তা নিশ্চিত করে জানতে কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানান ডা. আলমগীর। তিনি বলেন, সর্বশেষ গত মাসে জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা যায়, ডেলটার ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। চলতি মাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শেষ হবে। এরপর বলা যাবে, কোন ধরন সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে। তবে ধারণা করা যায়, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় ওমিক্রনের ক্লাস্টার সংক্রমণ শুরু হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঢাকায় সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এটি ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিনের মধ্যে সংক্রমণ হয়তো আরও অনেক বেড়ে যাবে।

লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ: গত ২০ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫০তম সপ্তাহের রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্ত ৬ দশমিক ৬ শনাক্ত হ্রাস পায়। একই সঙ্গে মৃত্যুও ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পায়। পরবর্তী সপ্তাহ থেকেই চিত্র পাল্টাতে থাকে। ২৭ ডিসেম্বরে ৫১তম সপ্তাহের রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্ত এক লাফে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পরের সপ্তাহে শনাক্তের সঙ্গে মৃত্যুও বেড়ে যায়। ৩ জানুয়ারি ৫২তম রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় রোগী শনাক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। মৃত্যু বৃদ্ধি পায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ। ১০ জানুয়ারি ৫৩তম সপ্তাহের রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্তের হার বেড়েছে ১২৫ দশমিক ১ শতাংশ। মৃত্যু বেড়েছে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ। এর বিপরীতে সুস্থতা কমেছে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভার্চুয়াল বুলেটিনে দেশে গত এক সপ্তাহে ১৬৯ শতাংশ রোগী বৃদ্ধির তথ্য জানান প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। গত বছরের ডিসেম্বরে শনাক্ত হয়েছিল ৪ হাজার ৫৮৮ জন রোগী। এর বিপরীতে জানুয়ারির মাত্র ১২ দিনে ১৬ হাজার ২০৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত আট দিনে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা ও রাঙামাটি করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় করোনার সংক্রমণ হার ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ। রাঙামাটিতে করোনার সংক্রমণ হার ১০ শতাংশ। হলুদ জোন বা অপরিবর্তিত মধ্যম ঝুঁকি বা কম থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে আছে দেশের সীমান্তবর্তী জেলা যশোর, রাজশাহী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নাটোর ও রংপুর। এ ছাড়া কম ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে দেশের বাকি ৫৪টি জেলা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনার সংক্রমণ গত ১৫ দিনে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনাক্তের হার ২ থেকে ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ডেলটার সঙ্গে দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এখনও ডেলটার সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মতো ওমিক্রন সংক্রমণ ছড়িয়েছে। ওমিক্রন সংক্রমিতদের অনেকের বিদেশে যাতায়াতের কোনো ইতিহাস নেই। সুতরাং বলা যায়, ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এটি আরও ছড়িয়ে পড়বে।

হাসপাতাল প্রস্তুত করার তাগিদ :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে হাসপাতালে ভিড় বাড়বে। অনেক দিন পর গতকাল মৃত্যুও বেড়েছে। অর্থাৎ সংক্রমণ গুরুতর হওয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ছে। তিনি বলেন, ডেলটার সঙ্গে ওমিক্রনও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। সুতরাং রোগী বাড়বে। একইসঙ্গে জনসাধারণকে সরকার আরোপিত স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে-এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ সংক্রমিতদের অনেকের বিদেশে যাতায়াতের ইতিহাস নেই। সুতরাং এটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে রোগীও বেড়েছে।

প্রতিবেশী ভারতে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়া ওমিক্রন পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, সেখানে ৫ থেকে ১০ শতাংশের মতো রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ছে। এখনও দৈনিক ২০ হাজার মানুষ সংক্রমিত হলে ১০ শতাংশ করে ২ হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়বে। এভাবে এক মাস সংক্রমণ চললে রোগী ভর্তির শয্যা মিলবে না।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে


সূত্র : সমকাল