দেশে প্রথম ‘তার ছাড়াই চার্জিং বৈদ্যুতিক গাড়ি’ উদ্ভাবন করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের একদল গবেষক।

রবিবার ওই বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. ইফতে খায়রুল আমিন সিলেট ভিউকে এ তথ্য জানান।


তিনি বলেন, ইইই বিভাগের ‘পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স’ ল্যাবে দুইজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গত বছরের জুন থেকে শিক্ষার্থীদের একটি দল এ যান উদ্ভাবনে কাজ শুরু করেন। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের ‘ডিজাইন এন্ড ইম্প্লিমেন্টেশন অব এ লাইট ডিউটি ইলেক্ট্রিক বিহিকেল ইন কর্পোরেটেড উইথ ওয়্যারলেস চার্জিং সিস্টেম’ নামক একটি প্রজেক্টের আওতাধীন এক বছর নাগাদ কাজ করেন শিক্ষার্থীরা।

এতে ফান্ডিং করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র। চলতি বছরের ১১ নভেম্বর গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবনের ধারণ উপস্থাপন করা হয় ও গবেষণাপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

উদ্ভাবক যারা
ওই প্রজেক্টের প্রধান ইনভেস্টিগেটর হলে ইইই বিভগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. ইফতে খাইরুল আমিন ও কো-ইনভেস্টিগেটর সহকারী অধ্যাপক নাফিস ইমতিয়াজ রহমান। এই দুই শিক্ষকের অধীনে বিভাগের শিক্ষার্থীদের ৯ সদস্যের একটি দল এ প্রজেক্টে কাজ করেছেন।

দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- ইইই বিভাগের গ্রাজুয়েট মো. নাহিদ ইসলাম, মো. কবীর হাসান, আজম জামান, চতুর্থ বর্ষের রেজওয়ান জাকারিয়া, মো. রিফাত হোসেন, আবির মাহমুদ, মো. সাজ্জাদ হোসাইন, মো. ইরফান উদ্দিন আহমেদ মেহেদী ও মো. তাওসিফুল আলম।

দলের সদস্যদের দাবি, এটি দেশে প্রথম ‘ওয়্যারলেস বা তারবিহীন লাইট ডিউটি বৈদ্যুতিক গাড়ি’।

তার ছাড়া চার্জ হবে কিভাবে ?
দলের সদস্য মো. কবীর হাসান সিলেটভিউকে বলেন, ‘‘এতে রয়েছে উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সি সংবলিত ইনভার্টার টেকনোলজি; যা ২০ কিলো হার্জ আউটফুট দিতে পারে। রয়েছে ব্যাটারি ম্যানেজমেন্টে সিস্টেম, ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। ট্রান্সমিটার এবং রিসিভারের ইনফুট এবং আউটফুট ম্যাচিং করার জন্য রয়েছে রেজন্যান্ট কাপলিং সিস্টেম।’’

‘‘তারবিহীন চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে ট্রান্সমিটার ও রিসিভার নামে দুইটি কয়েল রয়েছে। এর মধ্যে ট্রান্সমিটার কয়েলটি চার্জিং স্টেশনে এবং রিসিভার কয়েলটি গাড়িতে থাকবে। যাত্রীরা গাড়িতে বসানো থাকা অবস্থায় এটি চার্জিং করা যাবে। চার্জিং সময় বিদ্যুৎ যদি ২ অ্যাম্পিয়ার হলে ১০ ঘন্টা লাগবে ফুল চার্জ হতে। আর ৫ অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ থাকলে ৪ ঘন্টা লাগবে। বিদ্যুতের পরিমাণ যত বাড়ানো যাবে চার্জিয়ের সময় তত কম লাগবে।’’

গতানুতিক গাড়িগুলোর (টমটম গাড়ি) চার্জিংয়ে ‘প্লাগ ইন সিস্টেম’ রয়েছে এবং পৃথক রুমে লম্বা সময় ধরে চার্জ করতে হয়; যা সময়সাপেক্ষ এবং বড় একটি জায়গার প্রয়োজন। কিন্তু তারবিহীন সিস্টেমে এই ভোগান্তি সাধারণত থাকবে না বলে জানান কবীর।

তিনি আরও বলেন, এতে ‘সিরিজ কম্পেন্সেটিং নেটওয়ার্ক’ নামে একটি ধারক ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টির দিনে সাধারণত প্লাগইন চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এখানে তারবিহীন চার্জ হওয়ার কারণে সেই ঝুঁকিটা আর থাকছে না।

‘‘এ ছাড়া এই গাড়িতে রয়েছে ভুল সংযোগ প্রতিরোধী টেকনিক। যানটির আত্মরক্ষর জন্য ফিউজ ও সার্কিট ব্রেকারসহ সহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। সবমিলিয়ে যন্ত্রটির ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যদক্ষতা রয়েছে। এটি ৩ থেকে ৪ জন মানুষকে বহন করার সক্ষমতা রয়েছে।’’

এটির কার্যদক্ষতা বাড়াতে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান কবীর।

তৈরির পরে শিক্ষার্থীরা এই যান চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং সফল ভাবে এটি চলতে সক্ষম বলে জানান তিনি।

কবীর আরও জানান, যন্ত্রটির বাজারজাত করার জন্য ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। ‘শিগগরই বাজারজাত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।’

‘দেশের জন্য মাইলফলক’: গবেষকদলের প্রধান
প্রজেক্টের ইনভেস্টিগেটর সহযোগী অধ্যাপক ড. ইফতে খায়রুল আমিন বলেন, ‘‘বর্তমানে ইলেকট্রিক যানবাহনের চাহিদা প্রচুর বাড়ছে। তাই আমরা ইলেকট্রিক যানবাহনের মধ্যে কিভাবে তারবিহীন চার্জ ট্রান্সফার করা যায় সেটি বের করারা চেষ্টা করেছি; যার মধ্যে কোন ধরণের জটিলতা থাকবে না, কোডিং করা যাবে এবং সিকিউরিটির জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে।’’ 

‘‘এছাড়া রিমোট এরিয়ায় যেখানে পাওয়ার স্টেশনের তত্ত্ববধানে কেউ থাকবে না, সেখানে নিজ দায়িত্বে চার্জিং এর ব্যবস্থা করা যাবে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এই প্রকল্পটিতে হাত দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এ উদ্ভাবন বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’’


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ নোমান-১