অবহেলিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগ (এনটিডি) নিয়ন্ত্রণ করতে ৭৭৭ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। গতকাল দুবাইয়ের এক্সপো সিটিতে চলমান বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ১০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই প্রস্তাব দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এই প্রস্তাব দেন। এই তহবিলের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এনটিডি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করবে। এদিন প্রথমবারের মতো জলবায়ু সম্মেলনে স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়।

 


চতুর্থ দিনের কর্মসূচিতে এনটিডি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় বিশ্বনেতারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশে দেশে। দুই দশকে হিটস্ট্রোকে বয়স্কদের মৃত্যুর হাড় বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। বিশ্বের ৭০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে বায়ুদূষণের কারণে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ২০ বছরে ৫০ লাখ মানুষ দূষণ, হিটস্ট্রোক ও মশাবাহিত রোগে মারা যাবে। তাই এ সমস্ত রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে একদিকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে অন্যদিকে মনোযোগ দিতে হবে গবেষণায়। ইয়েমেনসহ ৩৯টি আফ্রিকান দেশকে লক্ষ্য করে নতুন এই তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আলোচকদের বক্তব্যে উঠে আসে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু এবং স্বাস্থ্যের সম্পর্ক দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।  আগে বাংলাদেশে ডেঙ্গু কয়েক মাস হতো, এখন সারা বছর। আগে ঢাকা ও বড় বড় শহরে হতো, এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এসব হচ্ছে। এগুলো ছড়ানোর জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা এখন রয়েছে। এমন আরও চ্যালেঞ্জ আগামীতে আসবে।

 

বাংলাদেশে গ্রিন হাসপাতাল প্রকল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করবে এডিবি : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে রক্ষা করতে সবুজ হাসপাতাল প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি। এ ছাড়া সরকারিভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য প্ল্যান্ট তৈরি করতে অর্থায়ন করছে এডিবি। গতকাল দুবাইয়ের এক্সপো সিটিতে চলমান বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এডিবি আয়োজিত একটি সাইড ইভেন্টে এ কথা জানানো হয়। ওয়াকিং দ্য টক উইথ ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যাকশন শিরোনামে ওই ইভেন্টে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী জাহিদ মালেক অংশগ্রহণ করেন। এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাতিমা ইয়াসমিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এরপর বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্য খাতে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে তাতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগে এক দুই-মাসের জন্য ডেঙ্গু দেখা দিলেও এখন তা বছরব্যাপী হচ্ছে।

 

পানি সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা : গতকাল অন্য এক এজেন্ডায় নিরাপদ পানি সুরক্ষা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মিঠাপানির ইকোসিস্টেম, শহুরে পানির স্থিতিস্থাপকতা এবং পানির স্থিতিস্থাপক খাদ্য ব্যবস্থা। সভায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিমন্ত্রী আহমেদ বিন আলী আল শায়েখ কীভাবে তার প্রজন্ম প্রবাহিত জল ছাড়াই বড় হয়েছিল এবং কীভাবে তার পিতার প্রজন্ম বেঁচে থাকার জন্য অঞ্চলজুড়ে পানি আমদানি করেছিল সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

 

তহবিল সরাসরি শহরগুলোতে পাঠানোর দাবি মেয়র আতিকের : একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা। এখনো অনেকের হয়তো মনে হতে পারে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছুই হয়নি।

 

কিন্তু বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এরই মধ্যে একটি খারাপ সময়ের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বৈরী পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনই সুস্পষ্ট প্রমাণ। এটি এখন আর আসন্ন পর্যায়ে নেই। গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে কপ২৮ সম্মেলনে এক সভায় এসব কথা বলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম।

 

ইকুয়েডরের কুইটো শহরের সাবেক মেয়র মৌরিসিও রোডাসের সভাপতিত্বে ‘আরবান এসডিজি ফাইন্যান্সের প্রথম উচ্চ অগ্রাধিকার স্টেকহোল্ডার সভায়’ ডিএনসিসি মেয়র বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে জেলা শহর কিংবা উপকূলীয় শহর থেকে মানুষ রাজধানীতে ছুটে আসছে। সেখানেও টিকে থাকার লড়াইটা সহজ নয়। জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে সবার আগে এসব মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ সময় মেয়র জলবায়ু পরিবর্তনের তহবিল সরাসরি শহরগুলোতে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এর পক্ষে জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষমতা বৃদ্ধির চুক্তিতে ১১৮ দেশের স্বাক্ষর : নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষমতা তিনগুণ করতে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন কপ২৮-এর চতুর্থ দিনে গতকাল ‘গ্লোবাল এক্সিলারেশন ফর ডিকার্বনাইজেশন চুক্তিতে’ স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের ১১৮টি দেশ। এ চুক্তির উদ্দেশ্য হবে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষমতা ২০২২ সালের বর্তমান ৩ দশমিক ৪ টেরাওয়াট থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১১ টেরাওয়াটে উন্নীত করা।

 

জানা গেছে, প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, জাপান, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, কেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া এবং স্পেনের মতো অনেক দেশ। তবে তুরস্ক, চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা এখনো স্বাক্ষর করেনি। এ ছাড়াও ৫০টি জ্বালানি উৎপাদক কোম্পানি এ ডিকার্বনাইজেশন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যারা বিশ্বব্যাপী ৪০ শতাংশের বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদন করে। এ চুক্তির অংশ হিসেবে, মিথেন নির্গমন হ্রাস প্রকল্পের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশগুলো।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/