মহিয়সী নারী সুহাসিনী দাস। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের নেত্রী, আজীবন সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। আজ ৩০ মে, তাঁর পঞ্চদশ মৃত্যুবার্ষিকী। বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যিক দীপংকর মোহন্তের সম্পাদনা ও অনুলিখনে সুহাসিনী দাসের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সেকালের সিলেট’ ও ইন্টারনেট অবলম্বনে এই লেখা।

সিলেটের রাজনীতি ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে এক অনন্য উজ্জ্বল নাম সুহাসিনী দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম- আমাদের প্রতিটি মুক্তির লড়াইয়ে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন সুহাসিনী। দেশ স্বাধীনের পর আজীবন নিবেদিত ছিলেন অসামান্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। ছিলেন অসহায়, বঞ্চিত আর নির্যাতিতদের আশ্রয়স্থল। আর সকলের প্রিয় মাসীমা। ‘আমাদের মাদার তেরেসা’ও বলতেন অনেকে।


বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের মধ্যভাগ। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের ধারা তখন কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। কংগ্রেসের রাজনীতি আবার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অহিংস গান্ধীবাদী ধারায়। ঠিক তখনই সিলেটের এক সাধারণ গৃহবধূ পারিবারিক গণ্ডি অতিক্রম করে যুক্ত হলেন সেই রাজনৈতিক ধারায়। স্রেফ চরকা দিয়ে খদ্দর কাপড় বুনতে গিয়ে সিলেট শহরের জামতলার এই গৃহবধূটি কংগ্রেসের মহিলা সংগঠনের সদস্য হলেন। সেই সাধারণ বধূ পরবর্তীকালে বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা সুহাসিনী দাস। তখন তাঁর ধারণা ছিল এই খদ্দরের মোটা কাপড় তৈরি করে তিনি দেশের জন্য কিছু একটা করবেন। পরবর্তীকালে কিছু একটা করতে চাওয়া এই নারীই সক্রিয় কংগ্রেসকর্মী হিসেবে আবির্ভূত হন।

সুহাসিনী দাসের কল্যাণময় স্পর্শ সিলেটের মাটি আঁকড়ে আছে। গোঁড়ামিতে ভরপুর সমাজে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক-কারিগরী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়াও স্বদেশপ্রেমের যে বিরল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন- তা এসময়ের প্রগতিশীল নারীদের প্রেরণা হয়ে কাজ করে। সিলেটের ইতিহাসের অংশ হয়ে মিশে আছেন তিনি। একজন ত্যাগী ও পরোহিতকারী নারী হিসেবে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। নির্যাতিত নারী ও অনাথ শিশুদের পাশে থেকেছেন মায়ের মতো, বোনের মতো। অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের জীবন প্রতিষ্ঠা লাভে। অসামান্য সামাজিক অবদান আর নারীমুক্তির আদর্শ হিসেবে সুহাসিনী দাস সিলেটবাসীর এবং এদেশের নারীশক্তির গর্র্ব।

বাংলা ১৩২২ সনের ১ ভাদ্র সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন সুহাসিনী দাস। বাবা প্যারীমোহন রায় ও মায়ের নাম শোভা রায়। সেসময় প্রাচীনপন্থীরা মেয়েদের পড়াশোনায় একরকম বাধা-নিষেধ দিয়ে রাখতেন তবুও নিজেদের বাড়িতে গড়ে ওঠা একটি পাঠশালায় শিক্ষাগ্রহন করেন তিনি। ১৩৩৭ সনে ১৬ বছর বয়সে  ঐতিহ্যবাহী কোঁটিচাঁদ প্রেসের মালিক কোঁটিচাদ দাসের পুত্র কুমুদচন্দ্র দাসের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। বিয়ের পর যখন সিলেটে আসেন সেসময় কিনব্রিজের উদ্বোধন হয়। দেশপ্রেম, শিক্ষা, সংস্কৃতি আর সম্প্রীতিতে সেসময় ছিল সিলেটের স্বর্ণযুগ।

বিয়ের মাত্র চার বছরের মাথায় ১৩৪১ সনে তার স্বামী কলকাতায় যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিধবা হয়েও তিনি নিজেকে চারদেয়ালের মাঝে আবদ্ধ রাখেননি। গতানুগতিক বিধবা নারীরা ধর্মীয় কাজে জীবনের বাকিটা কাটানোর রীতিতে আবদ্ধ থাকলেও সুহাসিনী দাস নিজেকে মানবসেবায় সঁপে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৩৩৯ সনে সারদা হলে ‘শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ’র সম্মেলনে যোগ দেন মাধুরী দাসের সাথে। সেখানে আশালতা সেন ও লীলা নাগের বক্তৃতা তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। রাজপথে থেকে দেশমাতৃকার সেবায় মনোনিবেশের সিদ্ধান্ত নেন সেখান থেকেই। চরকা দিয়ে সুতো কাটার কাজটাকেও বেছে নেন। একসময় এ কাজে খুব দক্ষও হয়ে ওঠেন। ১৯৪০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে মহিলাদের বিশাল সমাবেশে সংকল্প নেন আজীবন খদ্দর (দেশের তৈরি সাধারণ কাপড়) পরিধান আর সাধ্যমতো সমাজসেবা করার। আজীবন তিনি সেই সংকল্প রক্ষা করে গেছেন। নারীনেত্রী নরেশনন্দিনী দত্ত-কে তিনি কর্মজীবনের গুরু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

প্রায় প্রতিটি শিল্প সর্ম্পকে কিছু ধারণা থাকায় ১৯৪১ সালে সিলেট শহরে মহিলা সংঘ পরিচালিত শিল্প উৎপাদন কেন্দ্রের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কোন রকম সম্মানী গ্রহন ছাড়াই।

১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে রাজবন্দী হিসেবে ৯ মাস জেলে কাটাতে হয়। ১৯৪৩ সালে বিশ্বযুদ্ধের ঘন্টা বাজলে আর্তের সাহায্যে কাজে নেমে পড়েন। ধান-চালের দাম কমানোর আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৪৬ সালে জওহরলাল নেহরু সিলেট আসলে মহিলাদের পক্ষ থেকে যে সংবর্ধনা দেয়া হয় সেখানেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। একই বছর সুরমাভ্যালি চা শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন এবং কংগ্রেস কর্তৃক ‘শ্রীহট্ট জেলা চা বাগান শ্রমিক কংগ্রেস’ গঠনে তার অবদান অসামান্য। ১৯৪৬ সালে ঝড়ে বিধ্বস্ত সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই অঞ্চলের জনপদ পুর্নগঠনে এবং নোয়াখালীর দাঙ্গায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে থেকে কাজ করেন পরম বন্ধুর মতো।

১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আলুনিয়া গ্রামে কাজ করার সময় তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, ঠিক ঐসময় গান্ধীজির সাক্ষাত পান। অসুস্থ সুহাসিনী দাসের পাশে বসে তার খোঁজখবর নিয়ে যান গান্ধীজি। দাঙ্গা বিধ্বস্ত হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার কয়েকটি গ্রামে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষকে রিলিফ বিতরণ করা ছাড়াও পরবর্তীতে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যান।

দেশবিভাগ ঘটলে তার আত্মীয়-স্বজনসহ অনেক হিন্দুরা দেশ ছাড়েন। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়ে ওঠলেও নিজের প্রাণের শহর সিলেটেই থেকে যান তিনি। সেখান থেকেই এ অঞ্চলের মানুষের উত্থান-পতন অবলোকন করেন। ১৯৪৮ সালে ছয় মাস পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বলরামপুরে গ্রাম সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর গ্রামের সাধারণ মানুষের সেবা করার স্পৃহা আরো বেড়ে যায়। ১৯২৫ সালে কুলাউড়া রেল স্টেশনের পূর্ব দিকের পাহাড়ের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘রঙ্গিরকূল’ আশ্রমে সেবা করে গেছেন দীর্ঘ ৪৬ বছর। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত ও পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত। রঙ্গিরকূল আশ্রমে পরহিতে যারা বিলিয়ে দিয়েছেন জীবনের অনেকটা সময়। ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টের রাজনীতিকে সমর্থন দেন। ১৯৫৪-৫৬ সালে দূর্ভিক্ষের সময় সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশনে খোলা লঙ্গরখানায় কাজ করেছেন একজন কর্মী হিসেবে।

সিলেটের চালিবন্দরে উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাস ১৯৬২ সালে কংগ্রেসকর্মী নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠালগ্নেও পাশে ছিলেন সুহাসিনী দাস। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অসহায় ও নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় দান করে এখানেই একটি নারী আশ্রম গড়ে তোলেন সুহাসিনী দাস। নির্যাতিত মহিলা ও শিশুদের সংখ্যা বেড়ে গেলে তাদেরকে পুর্নবাসনের লক্ষে শুভাকাক্সক্ষীদের সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ সেবা সদন’।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সহকর্মীদের অনুপস্থিতিতে রঙ্গিরকূল আশ্রমে প্রায় একা হয়ে আর অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। সেখানে অনেক বাধা-বিপত্তি, জীবনের অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্বে কেটেছে অনেকটা সময়। তবে তাঁর মানসিক শক্তি আর সময়োপযোগী চিন্তা-ভাবনার ফলে আশ্রমটিকে আগল রাখতে সক্ষম হন। আশ্রমের নারী-শিশুদের সাথে থেকেছেন যুদ্ধের পুরো সময়। দেশ স্বাধীন হলে সিলেটের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

১৯৭৩ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মহাসম্মেলন নিকুঞ্জ গোস্বামীর সাথে যোগ দেন। সেখানে তাদের অভ্যর্থনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাষ্ট্রপতি ভিভিগিরি। দুজন মিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা তুলে ধরেন ঐ সম্মেলনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্পৃক্ততা থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে এনে সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে মনোযোগ দিতে লাগলেন। প্রবাসে মেয়ের সাথে মাঝে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। তার সামাজিক কর্মের অন্যতম অধ্যায় শুরু হয় সিলেট শহরে। ১৯৯৩ সালে নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী মারা গেলে রঙ্গিরকূল আশ্রম ছেড়ে চলে আসেন উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাস পরিচালনার দায়িত্বে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে ছাত্রাবাসে মেয়েদের থাকার জন্য তৈরি করেন ‘কোঁটিচাঁদ ভবন’।

সুহাসিনী দাসের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি অনেক। নেপালে বিশ্ব হিন্দু ধর্মীয় মহাসম্মেলনে যোগ দেন ১৯৮৮ সালের ২২ মার্চ। ১৯৯০ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা এদেশেও হিন্দুদের জানমাল ও ধর্মীয়স্থানের উপর প্রভাব ফেলেছিল। এসব দেবস্থলির পুননির্মাণ, হিন্দুদের পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছিলেন, তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে সুহাসিনী দাস পরিক্রমা ও হরিসভায় সক্রিয় অংশ নেন।

এদেশের নারী সংগঠকদের দিকপাল ব্রিটিশবিরোধী এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্ব বাংলার বিপ্লবী সুহাসিনী দাসকে ১৯৭৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সংবর্ধিত এবং সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ‘সমাজসেবা’ পুরস্কার দেওয়া হয়। পেয়েছেন রোকেয়া পদক। সিলেটের সকলের কাছে ‘মাসিমা’ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সর্ববরণীয় ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় পূর্ণ এই মহিয়সী নারী ২০০৯ সালের ৩০ মে প্রাণভূমি সিলেটেই পরলোকগমন করেন।

লেখক: পিংকু ধর, সহকারী রেজিস্ট্রার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়