বিশ্ব পরিবেশ দিবস প্রতি বছর জুন মাসের ৫ তারিখ পালিত হয়। এ উপলক্ষ্যে পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এই উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ধরিত্রী সম্পর্কে সচেতন করা। মানুষকে সচেতন করা এবং প্রকৃতিকে বাঁচানোর লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭২ সালে পরিেেবশ দিবস পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ৫ জুনকে World Environment Day (বিশ্ব পরিবেশ দিবস) হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালের পর থেকে প্রতিবছর এই দিনে পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ দিবস প্রথম পালিত হয় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। প্রতিবছর পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য থাকে।


এ বছরের জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচী (ইউনেপ) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো ‘Land restoration, desertification, and drought resilence’। এই প্রতিপাদ্যের বাংলা অনুবাদ হলো – 
‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা
অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন প্রাক্কালে ধরিত্রী রক্ষার বিষয়টি সামনে আসে। প্রাকৃত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করে, অন্যান্য সমস্ত জীবের সাথে এক সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করা ও পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে এই দিবস। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য টেকসই ও স্থিতিস্থাপক বিশ্ব তৈরিতে পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নেই। আজকে আমরা যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম¥ুখীন হচ্ছি তাহলো আমাদের গ্রহের অরণ্য হারিয়ে যাওয়া। বনভূমি কেবল লক্ষ লক্ষ প্রজাতির আবাসস্থল নয়, তারা বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অরণ্য হারিয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, জলোচ্ছ¡াস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে বিশ্ব। বন উজাড়ের পাশাপাশি শিল্পায়েেনর ফলে গ্রীণ হাউস গ্যাসের নিঃসরনে ব্যাপকভাবে বাড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে কার্বন নিঃসরনের পরিমাণ ছিলো প্রায় ৪০ বিলিয়ন টন, যা ২০২২ সালে তুলনায় ১.১% বেশি। কার্বন নিঃসরন বৃদ্ধি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৮৫০ সাল থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড শুরু হবার পর ২০২৩ সাল ছিলো সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিতে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে নানারকম প্রাকৃত্রিক দুর্যোগ যেমন: অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ¡াসের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বনায়ন ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩.৯২ বিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে। এই বনভূমির অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৪%) বনভূমি রয়েছে পৃথিবীর মাত্র ০৫ টি দেশে- রাশিয়া (২০.১%),  ব্রাজিল (১২.২%), কানাডা (৮.৬%), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৭.৬%) এবং চীন (৫.৪%)। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বনভূমি রয়েছে ১৪,৩২,৮০০ হেক্টর, যা পৃথিবীর মোট বনভূমি মাত্র ০.০০৪%। পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োাজন সেখানে আমাদের দেশের বনভূমির পরিমাণ ১৪.৪৭ ভাগ, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। কম বনভূমি ও বৈশি^ক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুকিপূর্ন তালিকায় প্রথম দিকে অবস্থান করছে। প্রাকৃতিক দুযর্োাগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নির্বিচার বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং সড়ক ও রেলপথের ফাঁকা জায়গায় বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় বৃক্ষ রোপন করতে হবে।

বর্তমান সরকার মুজিববর্ষে ১ কোটি বৃক্ষ রোপন করেছে, যা সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে বনভূমির পরিমাণ ১৬% এ উন্নীত করবে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জলাবায়ু পরিবর্তন মোকবেলায় সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের স্বীকৃতস্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমান সরকারের গৃহীত পরিবেশ বা›ধব পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে দেশের জনগণকেও সম্মুখ ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করতে আমাদেও সকলকে একসাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি  ব্যক্ত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আমাদের কাজগুলোই ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা যে বিশ্বকে রেখে যাচ্ছি তা গঠন করবে।

 

 

লেখক: মেরিনা দেবনাথ, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিলেট