পৃথিবীর যেখানে আছি সেখান থেকে বাংলাদেশ নামক দেশের দিকে তাকাই। বাংলাদেশের ঠিক উত্তর - পূর্ব কোণ অর্থাৎ ঈশান কোণে তাকিয়ে সিলেট দেখি। আমাদের সিলেট হজরত শাহজালাল রহঃ এর সিলেট, আমাদের সিলেট হাসন রাজা 'র সিলেট। সিলেটের উত্তর দিকে ভারতের যে মেঘালয় রাজ্য, সে রাজ্যের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে সিলেটের পশ্চিমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের এক প্রান্তীয় শহর সুনামগঞ্জ দেখি। খাসিয়া পাহাড়ের বেশ কিছু দূরে সুনামগঞ্জ শহর। আমরা যারা সুনামগঞ্জের মানুষ তারা সুনামগঞ্জবাসী। এখানে 'আমরা সুনামগঞ্জবাসী' শব্দটি উচ্চারণে যতোটা প্রাণ পায়, তার চেয়ে 'আমরা সুনামগঞ্জী' উচ্চারণ ভাষায় প্রাঞ্জল এবং শ্রুতিমধুর। সুনামগঞ্জের মাটিতে প্রোথিত শতো শতো বছর ধরে যাদের শিকড়, তাদের মুখে 'আমরা সুনামগঞ্জী' কথাটি যতোটা প্রাণময় হয়ে ঢেউ তোলে, ততোটা স্বতস্ফূর্তভাবে অন্যদের মাঝে হয় না। 

 



সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় অংশ সুনামগঞ্জ শহর। এটি সুরমা নদীর পাড়ে এবং বিল - হাওরের কোলে। মরমি কবি হাসন রাজা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে এখন আছেন বহু দেশে। সুনামগঞ্জ এখন হাসন রাজা 'র সুনামগঞ্জ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। এই সুনামগঞ্জ শাহ আব্দুল করিম এর জন্যে অধিক পরিচিতি পায়। সুনামগঞ্জে আছেন বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। আমাদের সুনামগঞ্জের বিখ্যাত লেখক শাহেদ আলী সর্বজন জ্ঞাত। রাধারমণ, দুর্বীনশাহ বিখ্যাত। সুনামগঞ্জকে পরিচিতি দিয়েছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এমএজি ওসমানী জন্মেছিলেন সুনামগঞ্জে। সুনামগঞ্জে জন্ম নিয়েছেন বহু কবি সাহিত্যিক শিল্পী। তাঁরা প্রতিনিয়ত সিলেট বিভাগ এবং সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে চর্চায় আছেন। একজন সুনামগঞ্জী হিসেবে এ আমার গৌরবের আবেগ। সিলেট শহরে থাকাকালীন আমি যখন ফেসবুকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাই, 'সিলেটের সাহিত্য মূলত সুনামগঞ্জের সাহিত্য' বলে, তখন অনেকে প্রতিবাদী হন। আবেগের দিকটি উপলব্ধি করতে পারেন না। বিভিন্ন কবি ও প্রাবন্ধিক তাঁদের কবিতা ও লেখায় সুনামগঞ্জের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন পরম মমতায়। সেখান থেকেই পাই, 'শহুরে জীবনের কিছুটা চঞ্চলতার মাঝে শ্যামল প্রকৃতি যেন তার আদুরে যাদুর কাঠি ছুঁইয়ে দিয়ে গেছে। টুপটাপ বৃষ্টি ঝরার পর খাসিয়া পাহাড় যেন খুব কাছে চলে আসত। নীল পাহাড় যেন চুপিচুপি ছুঁয়ে যেত আমার বহু বর্ণময় প্রকৃতি ও শহুরে জীবনের প্রাণময় চঞ্চলতার যুগলবন্দীতে অপরূপ এই সুনামগঞ্জ শহর। সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জনৈক ইংরেজ বলেছিলেন, I wonder why all the people of Sunamganj are not poet?' সুনামগঞ্জের নৈসর্গিক সৌন্দর্য কবি ও শিল্পীদের মনে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে চলে। এখানে বর্ষায়, শরতে ও হেমন্তে সুনামগঞ্জের প্রকৃতি সকল বয়সের মানুষের চোখ জোরায়, হরেক রকম পাখির ডাক মন ভরায়। বিল - হাওরে শীতকালে বহু বহু দূরের দেশ থেকে পাখিদের আগমন ঘটে এবং বর্ষাকালে ভাসমান কচুরিপানা ও জলজ বনের দলে আমাদের ডাহুক পাখির আসা - যাওয়া চোখে পড়ে। আহা কি সুন্দর সুনামগঞ্জ! 

 

 

বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায় সুনামুদ্দি নামক এক মোঘল সৈনিকের নামানুসারে সুনামগঞ্জ নাম হয়। আমি যেখানে থাকি সুনামগঞ্জের মাটির টান অনুভব করি অবিরত। আমি 'চেতনায় সারাবেলা' প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি, "সুনামগঞ্জের ধান ফসলের মাঠ, হাওর আমাকে কবি করে বাঁচিয়ে রাখে শত যন্ত্রণা ভুলিয়ে। সুনামগঞ্জ শহরের পাশে বয়ে চলা সুরমা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মেঘের বাড়ি মেঘালয় দেখে মন ভরে উঠে এক পরম পাওয়ায়। আমার আকাশে মেঘের পাহাড় উড়ে বেড়ায়, বৃষ্টি ঝরে, আবার রোদ উঠলে আলোয় অবগাহন করি। আমি জানি এমন প্রকৃতির কোলের সন্তান মানুষ প্রকৃতিগত প্রকৃষ্ট চরিত্রের। যা কিছু অসৎ তা দুষ্টজন আর অপসংস্কৃতির প্রভাব।... সুরমা প্রিয় নদী আমার। আমার যত প্রেম সুনামগঞ্জ ঘিরে, সুরমার জল ছুঁয়ে। আমার প্রথম কবিতা, আমার প্রথম নাটকের শহর সুনামগঞ্জ। আমার প্রথম প্রতিবাদী মিছিলের শহর সুনামগঞ্জ।... আমার শিকড় প্রোথিত সুরমার জলে লালিত হরিনাপাটি, অ আ ক খ এর হাত ধরে বেড়ে উঠা শহর সুনামগঞ্জ ও সিলেটের গভীরে।...সুরমার দুই কূলের মাটির গন্ধ আমার খুব চেনা। বাংলা সাহিত্যের কবি মধুসূদন বলেছিলেন, 'আমি বাঙ্গাল, আমার বাটী যশোহর।' আমার চেতনায় সারাবেলা জাগ্রত, আমি সুনামগঞ্জী, আমি সিলেটি, আমি বাঙালি, আমি বাংলাদেশী।" রাত শেষে সুনামগঞ্জ প্রতিদিন জেগে উঠে খুব ভোরবেলায় পূব আকাশে সূর্য উঁকি দেয়ার আগেই আর এখানে মানুষের ঘুম ভাঙে অনেক অনেক পাখির মধুর ডাকে। কতো যে পাখি সুনামগঞ্জের বাঁশঝাড়, নদী তীরে, পুকুর ও হাওরের কচুরিপানা ও গাছের ডালে বসে, লেজ দুলিয়ে মাঠে হেঁটে চলে এবং আকাশে উড়ে যায়! চড়ুই, বুলবুলি, ফিঙে, শালিক, কাক, চিল, বক, দোয়েল, মাছরাঙা, ঘুঘু, কবুতরের মেলা যেন সুনামগঞ্জ। আমাদের প্রিয় সব মাছ বোয়াল, রুই, পুঁটি, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, ভেদা, শোল, গজার, চিতল, মলা, ঢেলা, গুতুম, কাচকি, বাইম, পাবদা, ফোগা, রাণী ইত্যাদি নানান নামের মাছ পাওয়া যায় সুনামগঞ্জের খাল, বিল, পুকুর, নদী ও ছোটো বড়ো হাওরে। সুনামগঞ্জে আছে কিছু পাহাড় সদৃশ ছোটো ছোটো টিলা। আছে আনারস বাগান। এছাড়া সুনামগঞ্জের গ্রাম ও শহরে প্রায় সবার বাসা বাড়ির খালি জায়গায় আম, পেয়ারা, কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের গাছ দেখা মিলে। সুনামগঞ্জ জুড়ে হাওরাঞ্চলে কড়ছ গাছ বর্ষায় হাওরের সৌন্দর্য বাড়ায়। মে মাসে যখন বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাস তখন সড়ক পথে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যেতে যেতে গাছে গাছে ফুটে থাকা জারুল ফুল ভ্রমণকে উপভোগ্য করে তোলে। গ্রাম প্রধান সুনামগঞ্জের সুন্দর সুন্দর গ্রামের নাম হচ্ছে সৈয়দ পুর, ইসহাক পুর, ধল, কুলঞ্জ, এলেংজুড়ি, মোল্লাপাড়া, আমবাড়ি, হরিনাপাটি, রঙ্গারচর, লক্ষীপুর, আজিজ নগর, বড়দল, ফেনারবাক, মান্নার গাঁও, বুড়িস্থল, বাণীপুর, ভাটিপাড়া, মাইজবাড়ি, চেচান, পালপুর, কাটাখালি, বংশীকুন্ডা, চামুরদানি, বিন্নাকুলি, মুক্তির গাঁও ইত্যাদি শতো শতো গ্রাম। সুনামগঞ্জ হলো কবিতা ও গানের রাজ্য। নিজস্ব আঞ্চলিক গানের জন্যে সুনামগঞ্জের আছে আলাদা সুনাম। এখানে বিয়েতে গাওয়া হয়, 'সুনামগঞ্জীয়া রঙ্গিলা দামান যাইতা শ্বশুর বাড়ি...।'

 

 

সুনামগঞ্জের মায়ার চাদর বিশাল। সুনামগঞ্জ ভ্রমণ ও জ্ঞানার্জনের জন্যে একটি পছন্দের জায়গা। আছে কালনী, যাদুকাটা নদী। এখানে সুনামগঞ্জে আছে শতোবর্ষী সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়। আরও আছে ব্রিটিশ ভারতের সময়ের এইচ. এম. পি. উচ্চ বিদ্যালয় (পূর্ণ নাম হাজী মকবুল পুরকায়স্থ উচ্চ বিদ্যালয়), সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। সুনামগঞ্জে আছে বেশকিছু শিল্প কারখানা। ছাতক শিল্প শহর হিসেবে বিশেষ ভাবে পরিচিত। ছাতক, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারা বাজার, দিরাই, শাল্লা, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে সুনামগঞ্জের জেলা কাঠামো। প্রত্যেক উপজেলায় পর্যটকগণ ঘুরে ঘুরে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। বলা যায় একেবারে প্রকৃতিক সুনামগঞ্জ। প্রশাসনিক জেলা বিবেচনায় সুনামগঞ্জ আয়তনে বড়ো। পুরো সুনামগঞ্জকে একটি ছোট্ট আবেগী লেখায় তুলে ধরা যায় না। এখানকার ইতিহাস - ঐতিহ্যের খুঁজে লেখক পদ্মনাথ দেবশর্মা (ভট্টাচার্য) (১৮৬৮-১৯৩৮), লেখক শ্রী জগন্নাথ দেব, লেখক দীপংকর মোহন্ত এবং আরও অনেকের লেখা পড়ে জ্ঞান চর্চার সুযোগ আছে। এখানে বিশাল বিশাল হাওর কতো কতো দূরের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। সুনামগঞ্জের অতীত ঐতিহ্য গৌরবের। সুনামগঞ্জ আমার লেখায় আমার প্রকাশে খুব সামান্য ফুটে উঠে। কিন্তু ; সুনামগঞ্জী হিসেবে অনেক অনেক বেশি আলোড়িত হই সুনামগঞ্জের গানে ও কবিতায়। বহু গুণীজনের লেখায় সুনামগঞ্জ ফুটেছে বিশাল ইতিহাস নিয়ে। সুনামগঞ্জের একেকটি হাওর শতোশতো প্রজাতির লক্ষ লক্ষ মাছের বাড়ি। আমাদের আঞ্চলিক শব্দে এখনও এখানে আমাদের গ্রামের সহজ মানুষ হাওরকে 'আওর' বলি। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, দেখার হাওর আরও কতো হাওর আমাদেরকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে। ভালো থাকুক আমাদের সুনামগঞ্জ, ভালো থাকি আমরা সকল সুনামগঞ্জী।

 

 

লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক কলামিস্ট