এ. জে লাভলু, বড়লেখা:: নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা বইয়ের স্টলের সামনে ভীড় করেন লোকজন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। অনেকেই এসেছে স্কুলের পোশাক পরে। পোশাকের বৈচিত্র্য দেখেই বোঝা যায় যে এরা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বইটি তুলে নিয়েছে হাতে। কেউ বইয়ের প্রচ্ছদের ওপর চোখ বুলিয়েছে। কেউ বইয়ের মলাট উল্টে-পাল্টে দেখেছে। তারপর পছন্দের বইটি কিনে নিয়েছে। এসেছেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজের শিক্ষকরা। তারা নিজের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য কিনে নিয়েছেন বই। বইয়ের ঘ্রাণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছে বইমেলার অঙ্গন জুড়ে। সাথে ছিল অন্য আয়োজনও। গান, নৃত্য, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, স্থানীয় লেখকদের নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান।
বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে এমনই উৎসবের রং ছড়ানো পরিবেশ তৈরি হয়েছিল মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরশহরের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে বইমেলা প্রাঙ্গণে। বড়লেখা নজরুল একাডেমি চতুর্থ বারের মতো এই বইমেলার আয়োজন করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বইমেলা চলে।
সকালে ফিতা কেটে মেলার উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর মৌলভীবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আকমল হোসেন নিপু। উদ্বোধনী পর্বের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নজরুল একাডেমির সভাপতি ও বড়লেখা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক রঞ্জন নন্দী। প্রধান অতিথি ছিলেন বড়লেখা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ।
উপজেলা স্কাউটের যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবু ইমাম মো. কামরান চৌধুরী, লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সধারণ সম্পাদক তাইসির মাহমুদ, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তাজ উদ্দিন, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান শিপুল, বড়লেখা প্রেসক্লাবের সভাপতি অসিত রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক গোপাল দত্ত, কাউন্সিলর রেহান পারভেজ রিপন, উপজেলা স্কাউট সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম, সাংবাদিক লিটন শরিফ প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন নজরুল একাডেমির উপদেষ্টা ও বইমেলার সমন্বয়ক জুনেদ রায়হান রিপন।
বইমেলা উপলক্ষে জুনেদ রায়হান রিপন ও তপন কুমার দাসের সম্পাদনায় আলোকরেখা নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া বইমেলায় মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে অসিত রঞ্জন দাসের বড়লেখায় বাম রাজনীতি, দিল আফরোজ আমিনের এপার বাংলার বাবরি মসজিদ, নজরুল ইসলামের ইলোরা, অরুন চন্দ্র দাসের শিকার, গীতাংশু দলপতির সাহারার মাঝে, মৃণাল কান্তি দাসের হচ্ছি জখম ভীষণ রকম ও শিশুতোষ বই ছোট মামার ভূত রহস্য, কয়েছ আহমদ বকুলের মন জ্যোছনা, সমীরণ দাসের গানের বই গীত মাধুরী, প্রদীপ চক্রবর্তীর অপরাজিতার গায়ে সন্ধ্যা, শাহরিয়ার শাকিবের কয়েকটি সন্ধ্যাতারা, ফরিদা ইয়াছমিন নার্গিসের সেদিন বসন্তে, ইকরামুল শামীমের শেখ হাসিনা তোমাকে বলছি, মাসুম উল্লাহ খন্দকারের কুড়ানো স্বপ্ন, শুভাশীষ রায়ের হেম রঙ খাম, মান্না পালের গল্পে গল্পে নীতিশিক্ষা ও আজাদুর রহমানের অপ্রিয় অপ্রেমিক বইসমূহের।
এদিকে বইমেলা উপলক্ষে শিশু-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বইমেলার মঞ্চে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে স্থানীয় শিল্পীরা গান, কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন।
মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বইমেলায় এসে ভিড় করেছেন। অনেকেই তাদের পছন্দের বই কিনে নিয়ে ফিরছেন। উপস্থিত লেখকদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন অনেকে। সারা বেলাই উৎসবের মতো পরিস্থিতি ছিল বইমেলায়।
মেলায় মনসুর আহমদ তানিম তাঁর ভাগনি আর কে লাইসিয়াম স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠশ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ও ইসরাত জাহান নিয়ে এসেছেন। নুসরাত ও ইসরাত একসাথে মেলার স্টলে ঘুরে বই দেখেছে। দুজনের পছন্দও একইরকম। তারা বলেছে, তারা বইমেলায় এসে খুব খুশি। তারা অবসরে গল্প পড়ে। মেলায় এসেই একটি গল্পের বই কিনে নিয়েছে। আরও বই কিনবে।
বড়লেখা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী তাজিয়া করিম বলে, আমি প্রতি বছর বইয়ের টানে বইমেলায় আসি। মাত্র এসেছি। এখনও বই কিনিনি। বই দেখছি। পরে বই কিনবো।
একাদশ শ্রেণির আরেক ছাত্রী তাসমিয়া করিম বলে, এরকম দূরবর্তী একটি উপজেলা শহরে বইমেলা হওয়ায় আমরা নতুন নতুন বই কেনার ও পড়ার সুযোগ পাই। এখানে মেলা না হলে অনেক বইই আমাদের পড়া হতো না।
মেলায় আগত অতিথি লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তাইসির মাহমুদ বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বইপড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন বই পড়তে চায় না। অথচ আগে বইই আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল। বিনোদনের জন্য হোক কিংবা জ্ঞান অর্জনের জন্য হোক আমরা বই পড়তাম। কিন্তু সেই জায়গাটি এখন সোশ্যাল মিডিয়া দখল করে নিয়েছে। এখন আমরা পড়ি না, শুধু দেখি। আসলে পড়ার মধ্যে জ্ঞান, দেখার মধ্যে নয়। আমরা আশা করবো নজরুল একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত এই বইমেলা আমাদের বই পড়তে উদ্ধুদ্ধ করবে। বইয়ের প্রচার ও প্রসার বাড়াতে সহায়তা করবে।
মেলার বিকেলে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় বড়লেখা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা জানানো হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী। অন্যদের মধ্যে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন, সিলেটটুডের সম্পাদক কবির য়াহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান, ফনি চন্দ্র শীল প্রমুখ। সম্মাননাপ্রাপ্তরা হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম (মরণোত্তর), আসম আব্দুল মন্নান (মরণোত্তর), শফিউর রহমান শফিকুর (মরণোত্তর) ও জহির উদ্দিন (মরণোত্তর) এবং ফনি চন্দ্র শীল। এছাড়াও বৃক্ষরোপণের জন্য বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী ও বড়লেখা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তাজ উদ্দিনকে সম্মাননা জানানো হয়েছে।
নজরুল একাডেমির উপদেষ্টা ও বইমেলার সমন্বয়ক জুনেদ রায়হান রিপন বলেন, এখান (বড়লেখা) থেকে সবার পক্ষে ঢাকায় গিয়ে বইমেলায় বই কেনা সম্ভব হয় না। এরা যাতে এখানেও বইমেলার স্বাদ ও সুযোগটা পায়, এ লক্ষ্য থেকেই ২০১৯ সাল থেকে আমরা বইমেলার আয়োজন করছি। এবার বইমেলা উপলক্ষে আমরা আলোকরেখা নামে একটি সাময়িকী বের করেছি। এতে আমরা বড়লেখার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যাতে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে। আমরা এই বইমেলা ধারাবাহিক চালিয়ে যাবো।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/এজেএল
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.