মৌলভীবাজারে এবার দুর্গাপূজার প্রধান আকর্ষণ হাজার হাতের দুর্গা ও লাল দুর্গা। জেলায় ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন মিলে ১০০৭টি মন্ডপের মধ্যে কুলাউড়ার হাজার হাতের দুর্গা ও রাজনগরের লাল দুর্গা পূজা দর্শনার্থীর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধুমাত্র মৌলভীবাজার জেলা নয়, দেশের বিভিন্নস্থান থেকে এই দুই দুর্গা পূজা দেখতে এখানে আসতে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন বলে জানা গেছে।
প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও এ অনুষ্ঠিত হয় লাল দুর্গা পূজা এবং জেলার কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের শিববাড়ি মন্দিরে প্রথমবারের মতো পাথরের তৈরী সহ¯্রভূজা (এক হাজার হাতের) দুর্গা প্রতিমার পূজা হবে। ততবে শারদীয় এই উৎসবে মূল পূজা হবে রক্তবর্ণের ১০ হাতের স্থায়ী প্রতিমাতেই বলে জানান, শিব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত শ্রী কাজল ভট্টাচার্য্য। এছাড়া আগামীতে বাসন্তী পূজা ও হতে পাওে হাজার হাতের প্রতিমাতে।
মন্দিরের প্রধান পূজারী আচার্য্য পুলক সোম জানান, ২০১৮ সালে হাজার হাতের দুর্গা প্রতিমা নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্বপ্নদৃষ্টে পাওয়া এই প্রতিমা নির্মাণ করতে ২০জন শিল্পী চার বছর ধওে কাজ করে এবার তা শেষ করেন। ২৩ ফুট উঁচু তপ্তকাঞ্চন বর্ণেও প্রতিমাটি নির্মাণে পাথর, রড, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে।
জানা যায়, অনঙ্গ কুমার সোমের বংশধরদের জমিদারী শেষ হলে তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়লে প্রায় ৩১ বছর দেবী দুর্গার ঘটপূজা করেন। এরপর থেকে আর্থিখ অবস্থা না ফিরলেও পূজা কার্যক্রম এখনও চলছে। প্রতিবছর তাই এই পূজো দেখতে ৫দিনে লাখো দর্শনার্থীর সমাঘম ঘটে।
এদিকে সপ্তমী পূজা, ভক্তবৃন্দের পুষ্পাঞ্জলী, প্রসাদ বিতরণ, পাঠা বলি ও দেবী দুর্গার চরণে ভক্তির মাধ্যমে জেলার রাজনগরে লাল দুর্গা পূজায় হাজার হাজার পূণ্যার্থীরা অংশ নেয়। জাগ্রত এই লাল বর্ণের দুর্গা দেখতে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত লক্ষ ভক্ত অনুরাগীদের আগমন ঘটে। হাজারোর্ধ্ব পাঠা এখানে বলি দেওয়া হয়। এখানে মূর্তির রঙ লাল বর্ণের যা দেশের অন্যান্য মূর্তির চেয়ে আলাদা।
রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও গ্রামে স্বর্গীয় সর্ব্বানন্দ দাশের বাড়িতে লাল বর্ণের এই দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে প্রতিবছর। মূলত পারিবারিকভাবে প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে এই পূজা আয়োজন করা হলেও বর্তমানে এটা সার্বজনীন রুপ লাভ করেছে।
অষ্টমী ও নবমীর দিন লাল দুর্গা মন্ডপে দেবী দর্শন, মানত ও বলি দিতে নারী-পুরুষ, ছেলে বুড়ো, শিশুসহ হাজার হাজার ভক্ত ও পূর্ণার্থীদের পদভারে মূখরিত হয়ে ওঠে এলাকা।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে এসে কেউ বলি দিচ্ছেন, কেউ মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন, কেউ ভক্তি দিচ্ছেন। পূজান্ডপের আশপাশ এলাকা উলুধ্বনির শব্দে ভরে ওঠেছে। পূজাকে কেন্দ্র করে মেলায় ইত্যাদির দোকান বসে।
এখানে ষষ্ঠী পূজোর মাধ্যমে শুরু হয়ে দশমীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। পূজোতে আগত দর্শনার্থীদের প্রসাদ বিতরণ করা হয়। দর্শনার্থীরা মানত করে এখানে আসেন। স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, মধ্যবয়সী, আবালবৃদ্ধবনিতা দর্শনার্থীর সমাগমে মুখরিত থাকে পূজো প্রাঙ্গন। সপ্তমী ও নবমীতে পাঠা ও মহিষ বলি দেওয়া হয়। উলুধ্বনি, মোমবাতি প্রজ্বলন, আবাহন, অধিবাস ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজোর সমাপ্তি ঘটে।
পূজোকে ঘিরে আয়োজন করা হয় মেলার। মেলাতে খেলনা ও খাবারের দোকান, মূর্তির দোকান, পোস্টারের দোকান, কাঁসার বাসন, কাঁচ-রেশমি চূড়ি, নাগরদোলা, ধর্মীয় গ্রন্থ, বাঙালি খাবার স্থান পায়। রথ দেখা ও কলা বেচার মতো আগত দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীরা দুটোরই স্বাদ পান। পূজো উপলক্ষে নবমী ও দশমীর দিনে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকা লোকে লোকারণ্য থাকে। প্রতি বছরই এসময়ে এই দৃশ্য দেখা যায়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঢাকা, সিলেট ময়মনসিংহ বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসে দুইতিন দিন থেকে যান। অনেকেই আবার দিনে এসে দিনেই চলে যান।
এবারের পূজায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/তমাল/মাহি
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.