প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০১ (শনিবার)
সিলেটে বন্ধ কোয়ারি থেকে কীভাবে উঠে পাথর?

‘পাথরশূন্য’ উল্লেখ করে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর কোয়ারিতে ৫ বছর আগে পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে সম্প্রতি সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সেখান থেকে একাধিক চক্র দিন-রাত অবাধে পাথর উত্তোলন করছে। অনেক সময় সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের অংশ থেকেও উত্তোলন করা হয় পাথর। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের নিরব থাকার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান- শ্রীপুর পাথর কোয়ারিকে কেন্দ্র করে জৈন্তাসহ আশপাশ এলাকার প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের সংসার চলতো। কিন্তু গেল ৫ বছর পূর্বে কোয়ারিটি পাথরশূন্য হয়ে যাওয়ার কথা বলে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেন সংশ্লিষ্টরা। তবে গত ১৫ দিন থেকে একটি পাথরখেকো চক্র শ্রীপুর  কোয়ারির জিরো লাইন ১২৮০ নং মেইন পিলার অতিক্রম করে অন্তত ৩০ হতে ৫০ গজ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ভারতের ভূখণ্ড এবং বাংলাদেশের অংশ হতে পাথর আহরণ করছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে- স্থানীয় রাজনীতিবীদ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমান্ত রক্ষীবাহিনী এবং প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তিদের যোগসাজসে বন্ধ রাখা কোয়ারি হতে একটি চক্র পাথর উত্তোলন করছে।

তবে এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-বশিরুল ইসলাম। তিনি বলেন- যেহেতু আপনি ঘটনাটি জানালেন আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

সরজমিনে ঘুরে ও পাথর উত্তোলনকাজে নিয়োজিত একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- ‘আমরা পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রীপুর পাথর কোয়ারির জিরো লাইন অতিক্রম করে পাথর আহরণ করে নির্দিষ্ট স্থানে জমা করে রাখি। সেসব পাথর শ্রমিকদের অন্য একটি গ্রুপ সন্ধ্যার পর পর নৌকাযোগে আসামপাড়া ও চার নম্বর বাংলাবাজার এলাকায় নিয়ে যায়। কিছু পাথর অন্য একটি চক্র শ্রীপুর চা-বাগান এলাকা দিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে কয়েকটি চক্রের নির্দেশে জীবন বাজি রেখে বিএসএফ-এর তাড়া খেয়ে আমরা পাথর উত্তোলন ও সংগ্রহ করি। কিন্তু আমরা সঠিক মজুরি পাই না।’

শ্রমিকরা আরও জানান- ‘পাথর ব্যবসায়ীরা সীমান্ত প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে লিয়াজো করে আমাদের পাথর কোয়ারিতে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী আমাদের তাড়া করে। চুরি করার চাইতে যদি শ্রীপুর পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া হয় তাহলে ৩০ হাজার শ্রমিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। আর এতে সরকার প্রচুর পরিমাণে রাজস্বও আদায় করতে পারবে।’

এ বিষয়ে শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা ইমন আহমদ, রাজিব আহমদ, গিয়াছ উদ্দিন, ইসমাইল আলী, মালিক লাল দাশ, হোসেন আহমদ, কুতুব আলী বলেন- ‘এক সময় এই শ্রীপুর পাথর কোয়ারিতে বৈধ পন্থায় আমরা পাথর উত্তোলন করেছি। বিনিময়ে সরকার প্রচুর রাজস্ব পেয়েছে। সম্প্রতি কোয়ারি বন্ধ থাকার পরও পাথরখেকো বিভিন্ন চক্র নৌকাপ্রতি বড় পাথর ১৬শত টাকা এবং ছোট পাথর ১২শত টাকা, ট্রাকপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা হতে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা আদায় করছে। শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে টেলে দেয় ওরা।

তারা বলেন- ‘প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতার অবৈধ উপার্জন বন্ধ করতে এবং শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে সরকার যেন বৈধ প্রক্রিয়ায় শ্রীপুর কোয়ারি হতে পাথর আহরণের সুযোগ করে দেয়। আর তা না হলে বন্ধ কোয়ারি থেকে কেউ একটি পাথরও তুলতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা হোক।’

এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল আহমদ বলেন- ‘জৈন্তাপুরে জেলা প্রশাসকের সাথে সুধিজনের মতবিনিময় সভায় আমি অবৈধ পন্থায় এই পাথর উত্তোলন বন্ধ করার বিষয়টি উত্থাপন করি। তখন কিন্তু জেলা প্রশাসক মহোদয় কড়া ভাষায় জানিয়েছিলেন- সরকারের ঘোষিত যে সকল কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে; সেখানে কোনো কাজ করতে যাওয়া চরম অন্যায়। তা কখনও করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখিনি।’

তিনি আরও বলেন- ‘বন্ধ থাকা কোয়ারি হতে শ্রমিকরা জীবন বাজি রেখে প্রতিদিন শত শত গাড়ি পাথর উত্তোলন করছেন। এর প্রমাণ আমি  দুর্গাপূজা পরিদর্শনকালে শ্রীপুর কোয়ারিতে গিয়ে দেখলাম শত শত শ্রমিক পাথর নিয়ে আসছে। পাথর চুরি করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক ঝুঁকিতে থাকেন। তাই তাদের ও কর্মহীন থাকা ৩০ হাজার শ্রমিকে জীবন-জীবিকা এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের কথা চিন্তা করে শ্রীপুর পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’


সিলেটভিউ২৪ডটকম / সাব্বির / মুন্না / ডি.আর