প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২২ ১৭:১৩ (বুধবার)
সিলেটে ‘লেডি মাফিয়া’র মানবপাচার নেটওয়ার্ক, ভয়ংকর ফাঁদে যুবকরা

(প্রতীকী ছবি)

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে যুবকদের ফাঁদে ফেলতে মানব পাচারকারী চক্র বেপরোয়া। এ চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সিলেটের যুবকরাও। লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অবস্থান করে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করছেন কুমিল্লার শরীফ নামের একজন। তিনি তার স্ত্রীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশি নেটওয়ার্ক। খবর বাংলাদেশ প্রতিদিনের।

জানা গেছে, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক যুবক মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও মানব পাচারকারীদের উস্কানিতে তারা দেশে ফিরছেন। পরবর্তীতে তাদের ইউরোপ পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়াসহ বিভিন্ন ট্রানজিট দেশে আটকে রেখে করা হচ্ছে নির্যাতন। স্বপ্নচারী যুবকদের আহাজারি এবং নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। এরই মধ্যে অনেককে বাড়ি ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে। 

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের শ্রীধরপাশা গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলামের ছেলে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী একুয়ান ইসলাম (১৯) লাশ হয়ে ফিরেছেন দেশে। পরিবার জমি বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে তাকে ১৯ লাখ টাকায় পাঠিয়েছিলে ইটালির উদ্দেশ্যে। তিন মাস পর ইটালি যাওয়ার বদলে ছেলের লাশ এল বাড়িতে। 

শুধু জগন্নাথপুরের একুয়ানই নয়, এভাবে সিলেটের বিভাগের যুবকরা দালালের খপ্পরে পড়ে প্রায় লাশ হয়ে দেশে ফেরার খবর উঠে আসে গণমাধ্যমে। 

এদিকে, মানব পাচারের টাকায় দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ছে দুর্বৃত্তরা। পাচারকে বৈধতা দিতে মানব পাচারকারীরা আদায় করে নিচ্ছে রিক্রুটিং লাইসেন্সও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অবস্থান করে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করছেন কুমিল্লার শরীফ। লিবিয়ায় শরীফ ‘মাফিয়া শরীফ’ নামেই পরিচিত। সাত বছর ধরে লিবিয়ায় মানব পাচারের গডফাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। মাদারীপুরের বাসিন্দা দ্বিতীয় স্ত্রী সুমনা আক্তার সুমীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশি নেটওয়ার্ক। সুমীকে সার্বিক সহায়তা করছেন ফরিদপুরের আক্তারুজ্জামান মোল্লা। এই আক্তারুজ্জামানের মাধ্যমেই মাফিয়া শরীফ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাগিয়ে নিয়েছেন মেসার্স আরাফ ম্যানপাওয়ার লমিটেড নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স। দুবাই, মিসর, বেনগাজীতে রয়েছে তার নিজস্ব এজেন্ট। এর মধ্যে দুবাইতে কাজী সাহেব, বেনগাজীতে আবদুুল্লাহ, কুদ্দুস অন্যতম।

বাংলাদেশের সিলেট, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে ২০ শরীফের বেশ কয়েকজন এজেন্ট। দুই মাস আগে রাজধানীর দনিয়ায় ৭০ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন শরীফের দ্বিতীয় স্ত্রী সুমী। রাজধানীর দক্ষিণ দনিয়ার ৩ নম্বর সড়কের এস নাহার গার্ডেনের পঞ্চমতলায় ১৫০০ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাট। এর বাইরেও রাজধানীর শ্যামপুরে রয়েছে আরও দুটি ফ্ল্যাট। পার্শ্ববর্তী টঙ্গীতে রয়েছে একটি দোতলা বাড়ি। গত ১০ অক্টোবর ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে সুমনা সুমী তার মা মরিয়ম বেগমের নামে কিনেছেন টয়োটা ‘রেইজ’ ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল জিপ।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার আরব আলী নামের একজনের সঙ্গে প্রথম বিয়ে হয় সুমীর। তবে মানব পাচারের কাজে সম্পৃক্ত হয়েই পরিচয় হয় লিবিয়ার ত্রিপোলি থানায় কুমিল্লার শরীফের সঙ্গে। শরীফ লিবিয়ায় মাফিয়া শরীফ নামে পরিচিত। কিছুদিনের মধ্যেই শরীফ এবং সুমী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে তিন বছর আগে আরব আলীকে তালাক দিয়ে সুমী বিয়ে করেন লিবিয়ায় অবস্থানরত মাফিয়া শরীফকে। 

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে- গত ৩০ অক্টোবর মাদারীপুরের আলীম হোসেন মিলনের মা মনি আক্তারের দায়ের করা অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের শরীফের বিষয়টি অবগত হয়। সে লিবিয়ায় শীর্ষ মানব পাচারকারী। দুবাই, বেনগাজীতে রয়েছে তার নিজস্ব আস্তানা। এরই মধ্যে শরীফের দেশীয় এজেন্ট আলমগীর খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, শত শত বাংলাদেশি তরুণকে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে মানব পাচারকারী চক্রগুলোর ডেরায় আটকে রাখা হয়েছে। মুক্তিপণের টাকা পেলে ভূমধ্যসাগরে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। স্বজনরা টাকা না দিলেই ওই তরুণদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনে কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। আবার অন্য বন্দিদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিতে পৈশাচিক কায়দায় মেরেও ফেলা হয়।

সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে লিবিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো বন্ধ। তবু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রলোভনে দালালের খপ্পরে পড়ে দেশ ছাড়ছেন তরুণ-যুবকরা। তারা রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন দুবাই কিংবা মিসরের বৈধ ট্যুরিস্ট ভিসা। তারপর লিবিয়া যান। টাকা বেশি দিলে দুবাই থেকে চার্টার্ড প্লেনে করে লিবিয়ার বেনগাজীতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিপোলি। লিবিয়ায় ত্রিপোলির দুর্গম এলাকায় পাচারকারীদের আস্তানা রয়েছে। ইউরোপে নেওয়ার জন্য তরুণ-যুবকদের সেই আস্তানায় নিয়ে রাখা হয়। মাফিয়া শরীফের বিষয়ে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম-০৪