প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর, ২০২২ ১৫:৫৬ (রবিবার)
যার কলমে লেখা হয় হাজারো স্বপ্নের সনদ 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে সেখানকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের বড় অর্জন-‘সনদপত্র’ লেখেন প্রায় ২৬ বছর ধরে।

 

হাজারো গ্রাজুয়েট; যাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারের সচিব, চিকিৎসক কিংবা গুগল আর মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করছেন, তাদের সনদপত্র লিখেছেন এবং প্রতিনিয়তই লিখছেন। তেমনি একজন সনদ লেখক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল মুহিত হেলাল।

 

শাবিতে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি; কিন্তু ১৯৯৬ সালে অফিস সহকারি হিসেবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি জীবন শুরু করেন তিনি। নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের লক্ষাধিক সাময়িক ও মূল সনদ লিখেছেন এ কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের সনদও তাঁর হাতেই লেখা হয়ে থাকে।

 

২০০০ সালে পহেলা নভেম্বর তাঁর পদোন্নতি হয় ক্যালিওগ্রাফার হিসেবে; এরপর সিনিয়র ক্যালিওগ্রাফার এবং সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদন্নোতি পেয়েছেন।

 

শাবির প্রথম সমাবর্তন হয়েছিলো ১৯৯৮ সালের ২৯ এপ্রিল। এরপর দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি। এই তিন সমাবর্তনেই গ্রাজুয়েটদের স্বপ্নের সনদ লিখেছেন আব্দুল মুহিত।

 

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সমাবর্তনে খুব কম সময়ে সনদগুলো লেখা শেষ করেছেন তিনি। এত কম সময়ে সনদ লিখেছেন যা অনেকের দ্বারাই সম্ভব হতো না। একাই লিখেছেন; সঙ্গে আর কেউ না থাকায় অনেক সময় অসুস্থও হয়েও লিখতে হয়েছে তাঁকে। সনদ লেখায় চাপ থাকলে অনেক সময় রাতেও অফিসে বসে কাজ করেন তিনি।

 

সনদ লেখার প্রতি ভালোবাসা থাকায় বিদেশ থেকে নামি দামি ব্রান্ডের কলমও সংগ্রহে রেখেছেন এই কর্মকর্তা। এ বিষয়ে আব্দুল মুহিতের ভাষ্য, ‘‘দেশের নাম করা বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সর্বোচ্চ এ অর্জনকে আমি সর্বোচ্চ সম্মান দেই। সেজন্যই আমার এ প্রচেষ্টা।’’

 

পুরাতনকে জিইয়ে রাখাও তার শখের তালিকায় রয়েছে। সংগ্রহে রেখেছেন বহু পুরাতন মডেলের মোটরসাইকেল; রয়েছে সিডির ক্যাসেট আর ট্যাপ রেকর্ডারও।

আব্দুল মুহিতের বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায়। পড়াশোনায় স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন সিলেট শহরের মদন মোহন কলেজ থেকে। এর বাইরে তিনি এল.এল.বি ও সম্পন্ন করেছেন।

 

তবে নিজে না পারলেও সন্তানকে শাবিতে পড়াতে চান তিনি; সেই সাথে সন্তানের সনদটি লেখতে চান নিজের হাতে। এটাই তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা বলে জানান আব্দুল মুহিত।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মখলিছুর রহমান পারভেজ বলেন, ‘‘আব্দুল মুহিত তার কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সততা এবং কর্মদক্ষতার সঙ্গে তার কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন যাবত। এত বছর যাবৎ শিক্ষার্থীদের সনদ অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তিনি লেখে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীরাই হয়তো জানে না তাদের সনদ লিখার পেছনের গল্প।’’

 

‘‘তারা হয়তো তার নামও জানেন না। আব্দুল মুহিত অনেক সময় অনেক অসুস্থতা নিয়েও এ কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আরও সামনে এগিয়ে যাক আমরা সেই প্রত্যাশা করি।’’

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/নোমান/এসডি-০১