শাহাদাত রাসএল
বিউটিকে মাথা থেকে বের করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমাদের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে বহুবার বহুভাবে উঠে আসতে দেখেছি যৌনকর্মীর চরিত্র। কিন্তু একজন যৌনকর্মীর চরিত্রের এতগুলো স্তর কি আমরা একই চরিত্রের ভেতর আগে দেখেছি? সম্ভবত না।
বিউটিকে যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া স্বামীর বাস্তবতাও যখন বিউটি বর্ণনা করে নির্মোহ, পক্ষপাতহীন কিংবা সত্যের সঙ্গে একটা অবিশ্বাসে টালমাটাল প্রেমকে যেভাবে লালন করে। বিউটি এখানেই প্রচলিত চরিত্রের কাঠামো ভেঙে দিয়ে আমরা আটপৌরে চেনাজানা জীবনের মধ্যেই আরেকটা অদেখা জীবনকেই দেখতে পাই।
বলছিলাম মানিক বন্দোপাধ্যায়ের দুটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে, ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর চলচ্চিত্র ‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমা প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির প্রযোজক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা জসিম আহমেদ।
পনেরো বছর পর ঋত্বিক চক্রবর্তীকে সঙ্গী করে বড় পর্দায় ফিরলেন অভিনেত্রী অপি করিম। মায়ার জঞ্জাল চলচ্চিত্রের প্রতি বাংলাদেশের দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ এটা হলেও এটাও মনে রাখতে হবে যে এটা ফড়িং খ্যাত নির্মাতার কাজ। এমন অনেকগুলো কারণেই মায়ার জঞ্জালের মায়ায় পড়া।
মায়ার জঞ্জালের কেন্দ্রীয় চরিত্রে কারা- এই প্রশ্নটা করা হলে একটু ভাবতে হবে। কারণ এখানে প্রতিটি চরিত্র তার গল্প বলছে, অন্য কোনো গল্পের ওপর নির্ভর না করেই। মায়ার জঞ্জাল মূলত অনেকগুলো গল্পের একটা চলচ্চিত্র।
বিউটি চরিত্রে চান্দ্রেয়ী ঘোষ এবং সত্য চরিত্রে সোহেল মণ্ডল যেভাবে তাদের গল্প বয়ান করেন, সেখানে আমরা আকাশচুম্বী আধুনিক শহরের শ্রমজীবী কলোনির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন মানুষের নিষ্পাপ প্রেম এবং স্বপ্নের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা ঢুকে যেতে দেখি, পুনরায় প্রেম ও ক্ষমতার মাঝে দ্বন্দ্বের যে সূচনা সেখানে নির্বাক হয়ে যেতে দেখি অনেক ভাঙনের পথ পাড়ি দিয়ে আসা সাদামাটা স্বপ্নকে।
মায়ার জঞ্জাল চলচ্চিত্রের একটা রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু সেটা কোথাও কোট আনকোট করে দেওয়া হয়নি। যেভাবে মিউজিকের ওঠানামা দিয়ে নির্মাতা চেষ্টা করেননি দর্শকের চিন্তায় সেই প্রভাব ফেলতে নির্মাতা যা বলতে চান।
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি জানি যে, নিজের বলা গল্প থেকে নিজেকেই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখাটা সহজ কথা নয়। এই নির্মোহ গল্প বলাটাই সম্ভবত ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর মুন্সিয়ানা।
চান্দু চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী তার নামের সদ্ব্যবহার করেছেন, তবে এতোটা মিনিমালিস্টি চরিত্রে অপি করিমকে আমরা প্রথম আবিষ্কার করলাম মায়ার জঞ্জালের সোমার মধ্য দিয়ে। চান্দু চরিত্রে যেমন পুরুষতান্ত্রিক অহং রয়েছে, যা প্রকট হয়ে দেখা দেয় যখন সোমা সংসারের হাল ধরতে চান্দুর চেয়ে বেশি বেতনের চাকরি জুটিয়ে নেয়।
পাশাপাশি ছেলের সঙ্গে চান্দুর সম্পর্কের মধ্যে আমরা একজন বাবাকে আবিষ্কার করি, যিনি তার সন্তানের স্বপ্নের মাঝে নিজেকে সঁপে দেয় নির্দ্বিধায়।
মায়ার জঞ্জালে আরও দুটো চরিত্র রয়েছে যাদের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ব্রাত্য বসু অভিনীত গনেশ বাবু, একজন ধনাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি যার একজন পতিব্রত স্ত্রী রয়েছেন। যিনি গনেশ বাবু বাড়ি ফিরলে তার পায়ে তেল মালিশ করে দেয়।
তবুও কেন গনেশ বাবুকে আসতে হয় বিউটির কাছে? কেন গনেশ বাবুকে বিউটির কাছে এসে বলতে হয় অর্থনৈতিক শ্রেণি পরিচয়, রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের বাইরেও সে একজন মানুষ। যেই মানুষটাকে কেউ চেনে না। এই আক্ষেপটা কি আমাদের খুব চেনা না?
আবার বার্ধক্যজনিত অসুখে আক্রান্ত শুধাময় চরিত্রে পরাণ বন্দোপাধ্যায় আমাদের কিছু কথা বলে যায় তার বিগত স্ত্রীর স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে।
শুধাময়ের আক্ষেপগুলো আরেকবার ফিরিয়ে নেবে আমাদের সম্পর্কের কাছে। একবার দেখে নিতে ইচ্ছে করবে সম্পর্কের মাঝে কোথাও কিছু দেখে নেওয়া বাকি রয়েছে কি না।
দুটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ যখন পাশাপাশি চলতে থাকে তখন অনেক সময়ই দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় কিন্তু এখানে সেই বিভ্রান্তির সুযোগ রাখেননি নির্মাতা। ইমোশন চাপিয়ে দেওয়ার মিনিমাম চেষ্টাও করেননি নির্মাতা। পুরোটাই তিনি ছেড়ে দিয়েছেন দর্শকের ভাবনার ওপর।
যখন একটা ভয়ংকর দুঃসংবাদের সংবাদ জানতে পারে সোমা সেখানে আমরা দেখি পার্কের অজস্র হাস্যোজ্জ্বল মুখ। এমনকি সোমার অভিব্যক্তিটিও পুরোটা আমরা দেখতে পাই না।
এই যে দর্শককে দেখিয়ে দিয়েও আবার না দেখানোর ম্যাজিকটা এখানেই দর্শককে স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে তার অনুভূতি দিয়ে ভাবনায়। এটা একটা মাল্টি লেয়ার গল্পের চলচ্চিত্র। এবং প্রতিটি লেয়ারেই দর্শক সমাধান খুঁজবে তার নিজের ভেতর।
ছোটগল্প থেকে যেহেতু মায়ার জঞ্জাল নির্মিত তাই ছোট গল্পের সেই রবীন্দ্রনাথের বলা আলোচিত দিকটিকেও ধরে রেখেছে ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’।
মায়ার জঞ্জাল আপনি যেমন প্রচলিত আর্ট ফিল্মের খাঁজে ফেলতে পারবেন না, আবার মসলাদার বাণিজ্যিক ফিল্মের খাঁজেও ফেলতে পারবেন না। মায়ার জঞ্জাল যেমন দর্শককে আত্মমগ্ন করে তার নিজের আত্মপরিচয় খোঁজার তাগিদ দেয় তেমনি চলচ্চিত্রের কাঠামো হিসেবে নিজেই নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করে নিয়েছে। এই জায়গাটাতে মায়ার জঞ্জাল বাংলা চলচ্চিত্রের ভাষার একটা নতুন পাঠ।
এবার একটু ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাই। মায়ার জঞ্জাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তি দেখতে পাচ্ছি অহরহ। কিন্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের একটা নির্লিপ্ততা প্রকটভাবেই চোখে পড়ছে। এই নির্লিপ্ততাটা আমি আরেকবার দেখেছিলাম রেহানা মরিয়ম নুর চলচ্চিত্রের সময়ে।
যখন কোনো চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুনাম অর্জন করে তখন আমরা সেই চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে আরাম পাই না, কেননা তাতে আমার কাজের বিষয়গুলোও সামনে চলে আসে। রেহানা মরিয়ম নুর কান চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হলে আমরা সাদকে অভিনন্দন জানাতে ভয় পাই।
কারণ তাতে সবাই জেনে যাবে যে আমার চাইতেও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতা এদেশে রয়েছে। এটা আসলে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আর সিন্ডিকেট বিজনেস টিকিয়ে রাখার চিন্তার ফল।
মায়ার জঞ্জাল নিয়ে তাদের এই নিঃশব্দতাকে আমি বরং ইতিবাচকভাবেই দেখছি। কারণ তথাকথিত চলচ্চিত্রের মোড়লরা এতোদিন যেভাবে নিজেদের সিন্ডিকেট উৎপাদিত আবর্জনার প্রশংসা করে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছেন সেখানে তারা মায়ার জঞ্জালের পক্ষে লিখলেই বরং দর্শকের বিভ্রান্ত হওয়ার এই চলচ্চিত্রের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হতো।
আমাদের দেশীয় নির্মাতাদের মনে রাখা উচিত চলচ্চিত্র একটি কণ্ঠস্বর। যে কথা বলে তার নিজস্ব ভাষায়, চলচ্চিত্র কোনো সিন্ডিকেটের ভাষায় কথা বলে না। মায়ার জঞ্জালের মতো চলচ্চিত্র আরও বেশি নির্মাণ হলেই বাংলা চলচ্চিত্রের জঞ্জাল কমবে। অভিনন্দন জসীম আহমেদ, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী ও মায়ার জঞ্জালের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে।
লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/পল্লব-১
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.