প্রকাশিত: ০৩ মার্চ, ২০২৩ ১০:৫৯ (রবিবার)
দোয়ায় কী ভাগ্য বদল হয়?

শবে বরাতের অন্যতম তাৎপর্য হলো, এই রাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বছরের তাকদির বা ভাগ্যলিপি দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের কাছে দেওয়া হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি কি জানো, অর্ধ শাবানের রাতের কার্যক্রম কী?’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘না, হে আল্লাহর রাসুল।’ নবী (সা.) বলেন, ‘চলতি বছর যত সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং মারা যাবে, তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয় এবং এ রাতেই তাদের রিজিক অবতীর্ণ হয়।’ (মিশকাত: ১৩০৫)

তবে তাকদির বা ভাগ্যলিপি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক সংশয় কাজ করে। তাকদির কী? সবকিছু তাকদিরে লেখা থাকলে মানুষের ইবাদত-আমলের প্রয়োজনই-বা কী? দোয়ারই-বা প্রয়োজন কী?

কোরআন-হাদিসের আলোকে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজে দেখা যাক।

তাকদির বা ভাগ্যলিপি কী>>

জগতের সবকিছুর উৎপত্তি, বিনাশ, ভালো-মন্দ, উপকার-অপকার, পরিণাম প্রভৃতি মাখলুক সৃষ্টির অনেক আগেই আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন। একে ইসলামের পরিভাষায় তাকদির বা ভাগ্যলিপি বলা হয়, যা কিছু ঘটছে বা ঘটবে—সবই তাকদিরে লেখা রয়েছে। তাকদির অকাট্য। তাকদিরে বিশ্বাস করা ফরজ। মানুষের তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারিত, যা পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা সব সৃষ্টির তাকদির আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই লিখে রেখেছেন। তিনি বলেন, যখন আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল।’ (মুসলিম: ৬৯১৯)

আমলের প্রয়োজনীয়তা>>
তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারিত হলেও আমলের প্রয়োজন রয়েছে। বান্দার কাজ আমল করা। বান্দা তো আর জানে না যে ভাগ্যে কী আছে। কাজেই বান্দাকে আমল করতে হবে। ভালো কাজ করতে পারাটাই ভাগ্য ভালো হওয়ার লক্ষণ। যার ভাগ্যে যেমন রয়েছে, তেমন কাজই তার জন্য সহজ হয়। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিছু একটা হাতে নিয়ে চিন্তিত হয়ে মাটি খুঁটলেন। এরপর বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কোনো লোক নেই, যার অবস্থানস্থল জান্নাতে বা জাহান্নামে লিখে রাখা হয়নি।’ সাহাবিগণ বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তাহলে আমরা কি আমাদের লিখিত তাকদিরের ওপর ভরসা করে সব আমল ছেড়ে দেব?’ নবী (সা.) বলেন, ‘না; বরং আমল করতে থাকো। কারণ প্রত্যেকের জন্য তা-ই সহজ করে দেওয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব, পুণ্যবানের জন্য নেক কাজ করা সহজ হয়। আর হতভাগার জন্য পাপের কাজ করা সহজ হয়।’ এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ আয়াত পাঠ করলেন, যার অর্থ—‘যে ব্যক্তি দান করে, পাপের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ভালো কর্মের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে, তার জন্য আমি জান্নাতের কাজ সহজতর করে দিই।’ (বুখারি: ৪৬৬৬)

তাকদির দুই প্রকার>>
অনেক সময় তাকদির শর্তযুক্ত হয়। শর্তের উপস্থিতিতে এক রকম আর অনুপস্থিতিতে অন্য রকম হয়। আল্লাহ তাআলা সেটাও জানেন যে বান্দা শর্ত ভঙ্গ করার কারণে তার ভাগ্যে কী ঘটবে। চূড়ান্ত তাকদিরে অকাট্য সিদ্ধান্তই লেখা থাকে।

একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়—তাকদির দুই প্রকার। এক. তাকদিরে মুবরাম বা অকাট্য তাকদির। দুই. তাকদিরে মুআল্লাক বা শর্তযুক্ত তাকদির। তাকদিরে মুবরাম হলো যে তাকদিরে কোনো শর্তারোপ করা হয় না, বরং যা অকাট্য ও অপরিবর্তনীয়। আর তাকদিরে মুআল্লাক হলো যে তাকদিরে শর্তারোপ করা হয় এবং শর্তের অনুপস্থিতিতে তা অন্য রকম হয়। যেমন অমুক ব্যক্তি দোয়া করলে বা মা-বাবার অনুগত হলে তার আয়ু হবে ৭০ বছর, না করলে হবে ৬০ বছর।

উভয় প্রকারের তাকদির বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন, যা ইচ্ছা ঠিক রাখেন। আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব লওহে মাহফুজ।’ (সুরা রাআদ: ৩৯)। এই আয়াতে মূল কিতাব বলে সেই কিতাব বোঝানো হয়েছে, যাতে অকাট্য তাকদির রয়েছে। কারণ শর্তযুক্ত তাকদিরে লিখিত শর্ত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন যে এই ব্যক্তি শর্ত পূরণ করবে কি না। তাই চূড়ান্ত তাকদিরে অকাট্য ফয়সালা লেখা থাকে।

দোয়ায় কি তাকদির পরিবর্তন হয়>>
দোয়ার মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন হওয়া প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছু তাকদির (আল্লাহর ফায়সালা) রোধ করতে পারে না। আর মা-বাবার আনুগত্য ছাড়া কোনো কিছুই আয়ু বাড়াতে পারে না।’ (তিরমিজি: ২১৩৯) আয়াত দুটোতে তাকদিরে মুআল্লাক বা শর্তযুক্ত তাকদিরের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ দোয়ার শর্তে তাকদির অন্য রকম হতে পারে। যেমন: দোয়া করলে জীবন এমন হবে, নয়তো অন্য রকম হবে।

*লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে