প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৩ ১১:০১ (রবিবার)
সিলেট অঞ্চলে বসেছে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র

সিলেট অঞ্চল বজ্রপাতের জন্য ‘চিহ্নিত’ দুর্যোগপূর্ণ এলাকা। চলতি বর্ষা মৌসুমে আরো বজ্রপাতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার মেশিন) বসানো হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সম্প্রতি বসানো হয়েছে ২৪টি মেশিন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

হবিগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ২০২১-২২ অর্থবছরে হবিগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতনিরোধক যন্ত্র স্থাপনের জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলায় ১৫ লাখ, নবীগঞ্জে ৩০, বানিয়াচংয়ে ৪৫, আজমিরীগঞ্জে ৩০, হবিগঞ্জ সদরে ১৫, লাখাইয়ে ২৫, শায়েস্তাগঞ্জে ১০, চুনারুঘাটে ১৫ ও মাধবপুরে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে জেলার ৯ উপজেলায় লাইটিং অ্যারেস্টার মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।


সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র মতে, গত ১৬ ও ২৩ মার্চ হাওরে বজ্রপাতে মারা গেছেন দুজন। এরপর গত ২৩ এপ্রিল তিন উপজেলায় আরো ৬ জন মারা যান। গেল ২০২২ সালে প্রাণ হারান ১৯ জন। এর আগে ২০২১ এবং ২০২২ সালে ১১ জন করে প্রাণ হারান। ২০২০ সালে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে।

মৌসুমের শুরুতেই সিলেটে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। চলতি মাসের ২১ এপ্রিল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় বজ্রপাতে তিন শিশু মারা যায়। এর মধ্যে দরবস্ত ইউনিয়নের বিসনাটেক গ্রামের সুলেমান আহমদের ছেলে নাঈম আহমদ (৮) এবং মৃত দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে আঞ্জুমা বেগম (৬) বজ্রপাতে নিহত হয়। একই দিন বিকেলে জৈন্তাপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায় বাংলাবাজার গ্রামের আলম মিয়ার ছেলে ইমন আহমেদ (১০)। এই প্রাণহানীর একদিন পর ২৩ এপ্রিল রোববার সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে বজ্রপাতে ৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরমধ্যে কৃষক ও কিশোর রয়েছেন। ঈদের পরদিন রোববার সকালে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এসময় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে এই তিন জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা বজ্রপাতের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে ৩ জন, তাহিরপুর উপজেলায় একজন, দোয়ারাবাজারে ২ জন, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল একজন, কমলগঞ্জে একজন এবং সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় একজন মারা যান। আরো দু-একটি প্রাণহানীরও ঘটনা ঘটেছে।অন্যদিকে, হবিগঞ্জে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে ২১ জনের মৃত্যু হয়। এ জেলায় ২০২০ সালে ১৫ ও ২০২১ সালে ১২ জন বজ্রপাতে মারা যান। তিন বছরে মৃত্যু হয়েছে ৪৮ জনের। অর্থাৎ প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এ জেলায়।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, বজ্রপাত নিরোধক দ- স্থাপন করা গেলে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে লাইটনিং অ্যারেস্টার কাজ করবে। আশপাশে যারা থাকে তারা সুরক্ষা পাবেন। তিনি বলেন, জেলার সবকটা উপজেলায় এখনো বজ্রপাত নিরোধক দ- স্থাপন করা যায়নি। বন্যার কারনে টাকা ফিরে গেছে। জেলা প্রশাসক বলেন, মাত্র চলতি মৌসুমে যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এর কার্যকারিতা দেখতে হলে বর্ষা মৌসুমের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আবহাওয়া চরম রূপ নিচ্ছে। বজ্রপাত রোধে লাইটনিং অ্যারেস্টারের সংখ্যা বাড়ানো গেলে এর সুফলও পাওয়া যেতে পারে বলে তার মন্তব্য।
 

অন্যদিকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা ও মৃত্যুহার বিবেচনায় সরকার ২০১৬ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বজ্রপাতকে ‘দুর্যোগ’ ঘোষণা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্চ-এপ্রিল-মে মাস বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি থাকলেও মওসুম পরিবর্তনের কারণে মে-সেপ্টেম্বরেও বজ্রপাত হতে পারে। যার জন্য নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার। এরমধ্যে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সরকার দেশজুড়ে এক কোটি তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল; যদিও পরে ২০২২ সালের মে মাসে তা বাতিল করে দেয়া হয়। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ৩৮ লাখের মত তালগাছ লাগানোর পর দেখা গেছে, যন্ত্রের অভাবে গাছ মারা যায়। এছাড়া একটি তালগাছ বড় হতে ৩০ থেকে ৪০ বছর সময় লাগে। বজ্রপাত যেভাবে বাড়ছে তাল গাছ বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা রয়েছে। যার জন্য বিকল্প হিসেবে তালগাছের প্রকল্প বাদ দিয়ে বজ্র নিরোধক দণ্ড ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের সমীক্ষা প্রতিবেদন এর আলোকে দেশের অধিক বজ্রপাতপ্রবণ ১৫ টি জেলাকে চিহ্নিত করে। সেগুলো হল- নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর। এই প্রকল্পের আওতায় সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলাকে চিহ্নিত করে তাতে যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।

বজ্রনিরোধক দণ্ড পরিচিতি : তামা, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি ধাতুর বৈদ্যুতিক রোধের মাত্রা অনেক কম, তাই সাধারণত এ ধরনের ধাতু দিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড তৈরি করা হয়। এটি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। ৩০-৪০ ফুট লম্বা দ-ে তিন-চার ইঞ্চি জিআইপি পাইপ এবং তামার তার থাকে।


লাইটনিং অ্যারেস্টার: লাইটিং অ্যারেস্টার একটি ডিভাইস, যা বসানো থাকবে বজ্রনিরোধক দণ্ডের ওপর। এর মূল কাজ নির্ধারিত ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনা। এতে মিটারের মতো কাউন্টার রয়েছে, কয়টি বজ্রপাত হল তার হিসাব সেখানে থাকবে। সারাক্ষণ সক্রিয় থাকবে এই যন্ত্র।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইআ-০১