প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৪ ১৫:২১ (বুধবার)
ধূমপান জনস্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর

ধূমপান নিয়ে লেখা হচ্ছে পত্রিকায়, বিশেষ দিবসে ধূমপান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং ধূমপান বিরোধী প্রচারণা চালানো হয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। প্রকাশ্যে ধূমপান করা আমাদের এই বাংলাদেশে নিষেধ। তারপরও আমাদের দেশে ধূমপান হচ্ছে প্রায় প্রকাশ্যে। এমন নয় যে ধূমপান করা ক্ষতিকর — এ ব্যাপারটা যারা জানে না শুধু তারাই ধূমপান করছে। বরং ; দেখা যায় যারা ধূমপান করছে তারা ঠিক জানে ধূমপান বিষপান সমতুল্য। ধূমপান পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর এ কথা এখন সবাই জানে। কিন্তু সবাই মানে না। সারা পৃথিবীতে ধূমপান অর্থাৎ সিগারেটের ধোঁয়া মুখে টেনে নিয়ে ফুসফুসে প্রেরণ করার বিরুদ্ধে সচেতন মানুষ আন্দোলন করছে। বাংলাদেশে ধূমপান নিয়ে আলোচনা অতীত থেকে চলে আসছে। এক পর্যায়ে এ বিষয়ের উপর  কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করে আইন পাশ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই আইন বাস্তবায়ন করবে কে ? হ্যাঁ নিশ্চয় এ জন্যে সরকার আছে, আদালত আছে, আছে আইন অমান্যকারীকে জরিমানা ও গ্রেফতার করার জন্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের পুলিশ বাহিনী। পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা। 


ধূমপান খারাপ এটা জেনেও যারা ধূমপান করে তারা সমাজের অসচেতন মানুষ। অসচেতন এই ধূমপায়ী ব্যাপক অর্থে তার পরিবারের শত্রু। কারণ, একজন ধূমপায়ী যখন ধূমপান করে তখন তার ছেড়ে দেয়া ধোঁয়া তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের শ্বাসের সাথে তাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং এতে করে পরিবারের ছোটো শিশু থেকে শুরু করে সকলেই ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব দ্বারা ধীরে ধীরে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যান। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ধূমপান করবে না। সমাজ সচেতন মানুষ আইনের প্রতি থাকে শ্রদ্ধাশীল। আর বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষ হবেন সচ্চরিত্রের অধিকারী এবং সুন্দর রুচিবোধ সম্পন্ন। গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো সুস্বাস্থ্যই হচ্ছে মানুষের জীবনের অতি সাধনার বস্তু সুখ'র মূল। আর ধূমপান করার অর্থ হলো নিজে নিজেকে বিষ পান করানো। ধূমপান করলে মুখে, দাঁতের মাড়িতে, খাদ্যনালী, ফুসফুস, অন্ত্রে দূরারোগ্য এমন সব ভয়ঙ্কর অসুখ হয় যা শুনতেও ভয় লাগে। ক্যানসার নামক অসুখ যারা শুনেছে ও ওই অসুস্থ রোগী যারা দেখেছে তারা কখনও ধূমপান করবে না।


প্রিয় পাঠক, ধূমপান প্রসঙ্গ এলে আমরা খুব সহজে সিগারেটকে বুঝে থাকি। এখানে বুঝতে হবে সিগারেটের উপাদান হলো তামাক। এই তামাক থেকেই বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদা পাতা, চুরুট ইত্যাদি নেশা দ্রব্য তৈরী হয়। কাজেই ধূমপান নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ এলে তামাক উৎপাদন, তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুত এবং  এসব পণ্য বাজারজাত করণ নিষিদ্ধ করার গুরুত্ব উঠে আসে। বাংলাদেশ Framework Convention on Tobacco Control বা FCTC তে ১৬ জুন ২০০৩ সালে সাক্ষর করে। WHO অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম সম্মেলন মূলত মানুষকে ধূমপান ও তামাক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার জন্যেই হয়। আমরা দেখতে পাই জনস্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর বিধায় আমাদের সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০০৫ খ্রীষ্টিয় সালে একটি আইন করে যাতে যে কোনো পাবলিক প্লেসে ধূমপান এবং তামাক জাতীয় কোন দ্রব্য গ্রহণ বা সেবন করা না-হয় সে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। আইনে পাবলিক প্লেস হিসেবে অনেকগুলো স্থানকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো শিক্ষার্থী, কিছু আইনজীবী, পুলিশ ভাইদের কিছু সদস্য সহ সমাজের অনেক জনকে চলতে পথে দেখে মনে হয় যেন সকলেই এ ব্যাপারে উদাসীন। আমাদের সচেতনতার স্বার্থে এ বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার মনে করি। যেসব স্থানে ধূমপান করা যাবে না : সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা যে কোনো সাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, সরকারী বা আধা-সরকারি কিংবা কোনো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরী বা গ্রন্থাগার, বেসরকারি অফিস, লিফট, আদালত, বাস টার্মিনাল, বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিভিন্ন বিপণী প্রতিষ্ঠান, মেলা, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট স্থান, বহু জনগণের ব্যবহারের স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ আদেশ বলে বা বিশেষ আদেশ দ্বারা ঘোষিত অন্য কোন বিশেষ স্থান প্রভৃতি। এই আইন অমান্যকারীর জন্যে শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনে অনেক কথার উল্লেখ আছে যা এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা অনাবশ্যক। তবে প্রকাশিত পাবলিক প্লেস বা বলা যেতে পারে জনসমাগম স্থল এর পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা জরুরী মনে করি। আইনে আছে কোনো ব্যক্তি অনধিক আঠারো বৎসর বয়সের কোনো ব্যক্তির নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করবেন না, অথবা উক্ত ব্যক্তিকে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত করবেন না বা করাইবেন না। আরও আছে কোনো ব্যক্তি আইনের এ বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করলে তিনি পর্যায়ক্রমিক ভাবে উক্ত দণ্ডের দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হবেন। এসব আইন সাধারণ মানুষেরা না জানলেও আমাদের পুলিশ ও আইনজীবীরা নিশ্চয়ই অবগত।

 

আমাদের মনে রাখতে হবে এই বিশ্বে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্যোগেই সর্ব প্রথম ধূমপান ও নেশা বিরোধী ছাত্র সংগঠন ' সাস্ক ' গড়ে উঠে ১৯৮৬ খ্রীষ্টিয় সালের মহান ২১ শে ফেব্রয়ারি থেকে। সাস্ক অর্থাৎ স্টুডেন্টস্ এ্যান্টি স্মোকিং কমিটি। আর প্রতিষ্ঠার শুরুতেই একই বছরের ডিসেম্বরে সাস্ক জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে এই সাস্ক এর চেতনাকে ধারণ করে ১৯৮৭ সালে আমাদের দেশে জাতীয় ধূমপান বিরোধী সংস্থা-আধূনিক প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সাথে স্মরণীয় যে ১৯৮৬ খ্রীষ্টিয় সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্ব জুড়ে প্রত্যেক বছর ৩১ মে বিশ্ব ধূমপান মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের মঙ্গলের জন্যে মানুষ ভাবছে, সরকার ভাবছে। তাই আইন তৈরীর পাশাপাশি চলছে জনগণকে সচেতন করে তোলার কাজ। এখন আমি, আপনি, পুলিশ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, রাজনীতিক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আঠারো পেরোনো আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভরতার শক্তি তেজোদীপ্ত এক গুচ্ছ শিক্ষার্থী সহ সকলের নিজের প্রতি ভালোবাসা আর আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে আমরা পারবো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি আমাদের দুষ্ট ও অসচেতন মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আইন হয়েছে। কেউ আইন অমান্য করলে তা বাস্তবায়নের জন্যে আছে আদালত, আছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। মনে রাখতে হবে আপনার ও আমার সন্তান আছে, আইনজীবীর সন্তান আছে, পুলিশের সন্তান আছে, ব্যবসায়ীর সন্তান আছে, সর্বোপরি আমাদের সকলের আছে সন্তানদের জন্যে সুন্দর স্বপ্ন। এখন অনেকে ই-সিগারেট ধরেছেন। গবেষণায় উঠে এসেছে এতেও মানুষ আসক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং ই-সিগারেট কোনো ভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়। কাজেই কোনো ধরনের সিগারেট ও তামাক জাতীয় যেকোনো পণ্য গ্রহণ থেকে দূরে থাকতে হবে। তামাক জাতীয় পণ্য ও ধূমপান জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। এইটুকু সচেতনতা মন ও মননে গেঁথে নিতে পারলে একদিন আমরা ঠিকই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে একটি ধূমপানমুক্ত সুস্থ সুন্দর সবুজ দেশ উপহার দিতে পারবো। আর এখান থেকে আমরা হতে পারবো বিশ্বের এক অনুকরণীয় ধূমপান মুক্ত দেশ। এখন আমাদের প্রয়োজন ধূমপান নিয়ে আত্মোপলব্ধি জাগ্রত হওয়া। আমাদের সকলের মননের বিকাশ ঘটুক।

 

 


লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক কলামিস্ট