প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৪ ১৫:২৪ (বুধবার)
সিলেট ও সিলেটি          

আমরা সবাই সিলেটি। এই সহজ সরল সাবলীল বাক্যের উচ্চারণ সিলেটিদের মুখে যতটা প্রাঞ্জল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে অন্যত্র সেটা সম্ভরপর নয় কখনও। এখানে সিলেটি শব্দটি উচ্চারণ যে আলোড়ন তুলে তা সিলেট এর মানুষের অন্তর ছাড়া আর কেউ টের পায়না। যদিও কেউ কেউ সহজেই বলে ফেলবেন বুঝতে পেরেছি; কিন্তু আমার মনে হয় উপলব্ধি ব্যাপারটা এতোটা সহজ নয়।সেই অতি প্রাচীন কাল থেকেই এতোদঞ্চলের নাম সময়ে সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উচ্চারিত হয়েছে। তারপরও কোনো নামই এতোটা শক্ত ভিত্তি পায়নি। এদিক থেকে মানতেই হয় সিলেট এবং সিলেটি যেন নিখাদ প্রেমিক - প্রেমিকা। আর এই কথাটিও সত্য যে ' সিলেট ' শব্দটি ঐতিহাসিক ভিত্তি পেয়েছে। আসুন অনেক নামকে ছাড়িয়ে সিলেট শব্দটি কিভাবে সিলেটি তথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আসন গেড়েছে দেখে নেয়া যাক।


যে কোনো অঞ্চলের নামকরণের সাথে অনেক ঘটনা মিশে থাকে। আবার কখনও কখনও কোনো কোনো নাম ঐতিহাসিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ' সিলেট ' শব্দটি তেমনি একটি নাম যার রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আমরা সুদূর অতীত থেকে নিকট অতীতে ভ্রমণকারী হিসেবেই নিজেকে ভাবতে পারলে একটা সুন্দর শব্দ বাগান দেখতে পাব। সেই বাগানের হরেক রকম শব্দ কিভাবে প্রভাবিত করেছে আমাদের জীবনকে চলুন দেখে নেয়া যাক। আগেই উল্লেখ করেছি প্রাচীন কাল থেকেই সিলেট অঞ্চল বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এখন আসুন ইতিহাসের আলোকে খুব সংক্ষেপে দেখে নেয়া যাক আজকের সিলেট কখন কিভাবে কোন নামে পরিচিত ছিল।


বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তের মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে তিনশ ষাট আউলিয়ার দেশ কোথায়? কাল বিলম্ব না করে জবাব দিবে সিলেট। কিন্তু কিভাবে হলো জেনে নেয়া যাক। তুরস্কের অন্তর্গত ছোটো শহরে জন্ম নেয়া বিখ্যাত কোরায়েশ বংশীয় হজরত শাহজালাল ( রহ)  যখন মক্কা শরীফ থেকে আমাদের এ অঞ্চলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তখন তাঁর সাথে প্রথমে ছিলেন ১২ জন সঙ্গী। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট পৌঁছা পর্যন্ত তাঁর সফর সঙ্গী মোট ৩৬০ জনে উন্নিত হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন কামেল দরবেশ। প্রকৃত অর্থে এ কারণে সিলেটকে তিনশ ষাইট ( তিন শত ষাট)  আউলিয়ার দেশ নামে প্রায় সকলেই চিনে থাকেন। আবার জানা যায় প্রাচীন কালে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৪১ খ্রীষ্টাব্দে জলপথে সিলেট আসেন। তিনি আজকের ' সিলেট ' কে 'শিলাচটলো ' নামে আখ্যা দিয়েছিলেন। আমরা জানতে পারি বিখ্যাত পর্যটক আল বেরুনী সিলেটকে ' সিলাহাত ' বলেছেন। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক শেখ আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা সিলেট এসেছিলেন এবং তিনি 'সিলেট' কে ' কামরূপের বনভূমি ' বলে চালিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য লেখক এর প্রকাশিত গ্রন্থ পাঠান্তে সিলেটের অতীত কালীন নানা নামের পরিচয় জানা যায়। হট্টনাথের পাঁচালী গ্রন্থে সিলেট কে ' শীলাহট্ট ' বা ' শীলহট্ ' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। লোক মুখে কোনো কোনো কাব্যে সিলেটের আদি নাম ' শ্রীহট্ট ' পাওয়া যায়। কবি সাহিত্যিকরা সব সময় সিলেটের মায়ায় মজেছেন। ইতিহাসের আলোকে জানা যায়, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের শিলং থেকে সিলেট এসেছিলেন ১৯১৯ খ্রীষ্টিয় সালে। কবি তখন সিলেটের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছিলেন এবং আমাদের সিলেটকে ' শ্রীভূমি' নামে তাঁর লেখা এক কবিতায় উল্লেখ করেছেন। আবার হযরত শাহজালাল ( রহ) সিলেট এসেছিলেন, তাই আমাদের এই জনপদ ' জালালাবাদ' নামেও পরিচিত হয়েছিল। কথিত আছে হযরত শাহজালাল ( রহ) সিলেটে প্রবেশের পথে তৎকালীন রাজা গৌড় গোবিন্দ বড় বড় পাথর খন্ডের প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেছিলেন। আর তখন হযরত শাহজালাল (রহ) পাথরকে সরে যাবার জন্যে ' শিল হট ' বলে আদেশ করেন। 'শিল হট ' অর্থ হলো পাথর সরে যাও। সেই থেকে সিলেট কে ' শিলহট' নামেও মানুষ জানতো। এদিকে বৃটিশরা তাদের শাসনাধীন সিলেট কে ' সিল হেট ' নামকরণ করেছিল। এভাবেই কালক্রমে আমাদের এ অঞ্চল  ' সিলেট' নামে পরিচিত হয়ে উঠে। আর আমরা যুগে যুগে আমাদের পূর্ব পুরুষ এর শিকড় গাঁথা পিতৃভূমির পরিচয়ে হয়েছি সিলেটি। আমাদের সবুজ শ্যামল চা বাগান এর সিলেট, বিল - হাওরের সিলেট, ছোট ছোট পাহাড় ঘেরা সিলেট, ঝর্ণা ধারার সিলেট, সুরমা ও কুশিয়ারা ছোঁয়া সিলেট, পূণ্যভূমি সিলেট সুন্দর থাকুক, থাকুক অমলিন।

 

 

লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক কলামিস্ট