প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৪ ১৯:৩৬ (শুক্রবার)
সিলেটে টিলার নিচে ফাঁ দ, মৃ ত্যু ঠেকানোর উপায় কী

সিলেটে প্রতি বছর ভারী বৃষ্টিতে নরম হয় বিভিন্ন টিলা-পাহাড়ের মাটি। মাটি ধসে ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ঘটে বড় ট্যাজেডিও। গত ১০ বছরে সিলেট বিভাগে টিলার মাটি ধসে অন্ততঃ ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 


সর্বশেষ সোমবার (১০ জুন) সিলেট মহানগরের মেজরটিলার চামেলীভাগ আবাসিক এলাকায় টিলা ধসে মা-বাবা ও সন্তান মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একই স্থানে টিলা ধসে ১৯৯৭ সালে প্রাণ হারিয়েছিলেন হুনদা নামের এক যুবক।

 


ধসের ঘটনাগুলোর জন্য টিলা-পাহাড় কর্তনকেই মূলতঃ দায়ী করছেন পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সিলেটে কিছুতেই বন্ধ হয় না টিলা ও পাহাড়ের র মাটি কাটা। 

 

 


এদিকে, প্রতি বর্ষা মৌসুমে সিলেট জেলায় টিলা-পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও এগুলোর পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন মানুষজন। ফলে প্রতি বছরই সিলেটে ঘটে টিলা বা পাহড় ধসে মৃত্যুর ঘটনা।

 


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগরসহ সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়-টিলার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অন্তত ১০ হাজার পরিবার বসবাস করছে। কয়েক বছর আগেও যেসব টিলা এলাকায় মানুষের আনাগোনা ছিল না, সেসব এলাকায় এখন গড়ে উঠেছে বসতি।

 

 

পরিবেশবীদদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা এসব মানুষকে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের কার্যতঃ কোনো পদক্ষেপ নেই। শুধু প্রাণহানি ঘটলে কিছুটা টনক নড়ে প্রশাসনের। মাঝে-মধ্যে অভিযান দিলে টিলার নিচের মানুষ কয়েক দিনের জন্য অন্যত্র যায়। কিন্তু অভিযানের পরই ফের তারা ফিরে আসেন।

 


তবে প্রশাসন বলছে- বার বার সতর্ক করার পরও টিলার নিচে ঘর বানানো মানুষজন অন্যত্র যান না। তাদের সরাতে প্রতি বছরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ।

 


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগরের এয়ারপোর্ট ও জালালাবাদ এলাকা, সদর, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় প্রায় ৪শ পাহাড়-টিলা রয়েছে। যদিও এ সংক্রান্ত কোনো সঠিক পরিসংখ্যান জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় টিলার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।

 

 

বেলা সূত্র জানায়, সিলেট মহানগর ও সিলেট সদর উপজেলায় ২শ টিলা রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় আরও দুইশর উপরে টিলা আছে। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ টিলাই অর্ধেক ও আংশিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। টিলা কেটে ফেলার কারণে ও কাটা অব্যাহত থাকায় দিনদিন ঝুঁকি বাড়ছে। ভারী বৃষ্টি হলেই এসব টিলার মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে এবং নিচে বসবাসকারী লোকজনের মধ্যে হতাহত হন।

 


পরিবেশ-বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের দাবি- গত তিন দশকে সিলেটের ৫০ ভাগ টিলা ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী পাহাড়-টিলা কাটা নিষেধ। অনেক সসময় সিলেটে টিলা কাটা চলে দিন-দুপুরে। কেউ টিলা কেটে বিক্রি করছেন মাটি, আবার কেউ মাটির বিনিময়ে অনুমতি দিচ্ছেন টিলা কাটার অনুমতি। পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশের অভিযান হলে টিলা কাটার দায়ে আটক হন শ্রমিক। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান টিলার মালিক ও মাটি কাটার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার। আর কোনো কোনো স্থানে টিলার মালিককে জরিমানা করা হলেও তাতে দমে থাকেন না তিনি, কিছুদিন পর নবউদ্যমে শুরু করেন টিলা কর্তন।

 


এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেট-১ আসনের এমপি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি মঙ্গলবার (১১ জুন) মেজরটিলার চামেলীভাগ আবাসিক এলাকায় টিল ধসে নিহত ৩ জনের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন- সিলেটে অবৈধভাবে টিলা কাটা হয় প্রচুর। এগুলো রোধ করতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ কমিটি করে টিলা কাটা ঠেকাতে হবে। অভিযোগ রয়েছে- স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এসব কাজে জড়িত থাকেন। তাই তাদের মাধ্যমেই টিলার মাটি কাটা রোধ করা প্রয়োজন।

 


এছাড়া প্রশাসনকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান সিলেট-১ আসনের এমপি।

 


বেলা বলছে- সংগঠনটির দায়েরকৃত একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ উচ্চ আদালত পাহাড়-টিলা কাটা রোধ করে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং টিলার পাদদেশে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সিলেটে অদ্যবধি এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। টিলা কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে টিলা ধস ও মৃত্যু  থামানো যাবে না।

জরুরিভিত্তিতে টিলার পাদদেশে বসবাসকারীদের তালিকা করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, টিলা কাটা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও উচ্চ আদালতের নিদের্শনা সম্বলিত সাইনবোর্ড সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে লাগানো এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানিয়েছে বেলা।

 


সিলেটে টিলা ধসে মৃত্যুর সর্বশেষ ঘটনা : 
সিলেট মহানগরের ৩৫ নং ওয়ার্ডের মেজরটিলার চামেলীভাগ আবাসিক এলাকায় টিলা ধসে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (১০ জুন) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। যৌথভাবে তৎপরতা চালিয়ে দুপুর ১টার দিকে ৩ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। উদ্ধারকাজে স্থানীয় লোকজন ও সিটি করপোরেশনের কর্মীরা সহযোগিতা করেন।

 


দুর্ঘটনায় ঘরের নিচে চাপা পড়েছিলেন চার পরিবারের মোট ১১ জন। এর মধ্যে ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

 


নিহতরা হলেন- চামেলীভাগ আবাসিক এলাকার ২ নং রোডের ৮৯ নং বাসার মৃত রফিক উদ্দিনের ছেলে আগা করিম উদ্দিন (৩১), করিমের স্ত্রী শাম্মী আক্তার রুজি (২৫) ও তাদের ছেলে নাফিজ তানিম (২)। করিম একটি ইন্টারনেট কোম্পানির ক্যাবল অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন।

 

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চামেলীভাগ আবাসিক এলাকার ৮৯ নং বাড়িটি করিম উদ্দিনদের পৈত্রিক। তারা ২ ভাই ও ৪ চাচা এ বাড়িতে থাকেন। তাদের ঘরটি টিনের চালার আধাপাকা। ঘরের প্রায় ৫ শ ফুট পেছনে একটি বড় টিলা। টিলা ও ঘরের মাঝখানে কয়েক শতক খালি জায়গাও রয়েছে।


তবে স্থানীয়দের অভিযোগ- খালি জায়গায়ও টিলা ছিলো। কাটা হয়েছে সে টিলার মাটি। 


রবিবার দিবাগত রাতে ভারী বৃষ্টির কারণে মাটি গলে সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বিকট শব্দে টিলাটি ধসে সবাই ঘুমে থাকা অবস্থায় করিম উদ্দিনদের ঘরের উপর এসে পড়লে ঘর ও মাটির নিচে চাপা পড়েন মোট ১১ জন। এর মধ্যে করিমের বড় ভাই আগা রহিম উদ্দিন, তাদের মা, রহিমের স্ত্রী ও সন্তান, করিমের স্ত্রী-সন্তান এবং তার ৪ চাচা মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে আগা মাহমুদ উদ্দিন, আগা বাবুল উদ্দিন, আগা বাচ্চু উদ্দিন ও আগা শফিক উদ্দিন। এদের মধ্যে করিম ও তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়া বাকি ৬ জনকে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় জনতা ঘটনার দুই ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করেন। 

 

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে অকুস্থলে ছুটে এসে শাহপরাণ থানাপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স  সিলেটের দুটি স্টেশনের ৩টি টিম, সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মী ও স্থানীয় জনতা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। ঘণ্টাখানেকের প্রচেষ্টায় করিম ও তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়া ৮ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে কয়েকজন আহত ছিলেন। তাদের পরে  সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

 

এদিকে, সরু গলির কারছে দুর্ঘটনা কবলিত ঘরের কাছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও সিসিকের মাটি কাটার যন্ত্র (এক্সভেটর) যেতে না পারায় এবং বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজে দেরি হতে থাকে। একপর্যায়ে বেলা পৌনে ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর ৩টি টিম উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করে এবং ঘরের পেছন দিকের একটি দেওয়াল ভেঙে একটি এক্সভেটর চাপা পড়া ঘরের কাছাকাছি নিয়ে মাটি সরানো হয়। দুপুর ১টার দিকে উদ্ধার করা হয় করিম, শাম্মী ও তানিমের নিথর দেহ। এসময় সেনাবাহিনীর টিমের চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পরে রাত ৯টায় চামেলীবাগ জামে মসজিদে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে লাশগুলোর দাফন করা হয়।

 

এ ঘটনায় ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) হোসাইন মো. আল-জুনায়েদকে প্রদান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

 


২০২২ সালে ঘটে এক পরিবারের ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা :
২০২২ সালের ৬ জুন ভোরে জেলার জৈন্তাপুর উপজেলায় টিলাধসে একই পরিবারের ৪ জন নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। উপজেলার চিকনাগুল ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের পূর্বসাতজনি গ্রামে ঘটা এ মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতরা ছিলেন- গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে জুবায়ের আহমদ (৩৫), তার স্ত্রী মোছা. সুমি বেগম (৩০), জুবায়ের আহমদের ছেলে সাফি আহমদ (৫) এবং জুবায়ের আহমদের ভাই মাওলানা রফিক আহমদের স্ত্রী মোছা. শামীমা বেগম (৪৮)। 

 


ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোতে সরাতে নতুন করে উদ্যোগ :
সোমবার মেজরটিলায় টিলা ধসে ৩ জন নিহতের পর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার সিলেটের যেসব টিলা-পাহাড়ের নিচে লোকজন বসবাস করছেন এসব পাহাড়-টিলায় লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিংয়ের মাধ্যমে এসব পরিবারকে দ্রুত সরে যেতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

 


জেলা প্রশাসনের বক্তব্য :
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন মঙ্গলবার বিকালে সিলেটভিউ-কে বলেন, মেজরটিলায়  নিহতের ঘটনায় ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ওই এলাকায় টিলার পাদদেশে যারা অবস্থান করছেন তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং টিলাগুলোতে লাল পতাকা উড়ানো হয়েছে।


তিনি আরও বলেন- প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমের শুরুতে প্রতি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়া হয়। সে নির্দেশের প্রেক্ষিতে  টিলার নিচে বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়। মেজরটিলার ঘটনার পর জেলার বিভিন্ন স্থানে এভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিলা-পাহাড়গুলোর উপর লাল পতাকা উড়ানো হয়েছে। ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে ফেলা হবে।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডি.আর