প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ২০:০৯ (শনিবার)
‘শেখ হাসিনার জন্য বড় থ্রেট ছিলেন হারিছ চৌধুরী’

আবুল হারিছ চৌধুরী। বাড়ি কানাইঘাট উপজেলার দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগর গ্রামে। ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও বিশেষ সহকারী। বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালে বেশ প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ ছিলেন হারিছ চৌধুরী। মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) ছিলো তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

 


এ উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বিকালে সিলেটের শাহজালাল দরগাহ মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত হন হারিছ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে সামিরা তানজিম চৌধুরী। দোয়া শেষে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শীর্ষ নিউজ পোর্টাল সিলেটভিউ-কে একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এসময় সামিরা তাঁর বাবার মৃত্যুরহস্য, লাশ দাফন ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গোয়েন্দা বাহিনী নিয়ে নানা কথা বলেন। সামিরা তানজিম চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

 

সামিরা তানজিম চৌধুরী সিলেটভিউ’র নিজস্ব প্রতিবেদক নিবেন্দু তালকুদারকে বলেন- ‘কিশোর বয়সে আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। একদম শুরু থেকেই তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান। সিলেট বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি ছিলেন। যুবদল তাঁর হাত ধরে গড়া। আমার বাবা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিশ্বস্ত কর্মী ছিলেন। পরবর্তীত বেগম জিয়ারও আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। বিভিন্ন ক্রাইসিস সময়ে বেগম জিয়া আমার বাবার পরামর্শ নিতেন। আমার বাবা প্রচারবিমুখ ছিলেন। যে কারণেই দলের নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখতে নিজেকে আড়াল করে রাখেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। বিভিন্ন সময় সিলেটে গ্রামের বাড়িতেও এসেছিলেন, পরে আবার ঢাকায় অবস্থান করেছেন।’

 

তবে বাবা এক যুগেরও বেশি সময় ১৫ বছর ঢাকার কোথায় কীভাবে ছিলেন- তা খোলাসা করলেন না মেয়ে সামিরা।


তিনি সিলেটভিউ-কে আরও বলেন- ‘আমার বাবা সদ্যসাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার কাছে অনেক বড় থ্রেট ছিলেন। তাঁকে দমাতে সরকার নানা কুট-কৌশল অবলম্ব করে। মিডিয়ার মাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালায়। বাবার একের পর এক বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। বিগত ১৫ বছর বাবার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উত্তোলন করা হয়েছে সবই সরকারের সুগভীর ষড়যন্ত্র। আবার বাবা খুব ট্যালেন্টেড রাজনীতিবিদ ছিলেন। ফলে আমার বাবাকে থামাতে পারলেই বিএনপিকে বেশ খানিকটা দুর্বল করা যাবে- এজন্য আমার বাবার উপর এত দমন-পীড়ন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।’


এক প্রশ্নের জবাবে সামিরা তানজিম চৌধুরী বলেন- ‘আমার বাবা কখনো দেশের বাইরে যাননি। প্রথম থেকেই দেশে ছিলেন, ঢাকাতেই মৃত্যুবরণ করেন। আমরা চেয়েছিলাম সিলেটে তাঁর  পৈত্রিক ভিটায় দাফন করতে। কিন্তু স্বৈরাচার সরকারের গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন বাহিনীর অপতৎপরতায় সেটা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক বিষয়- আমার বাবার মৃত্যু নিয়েও সাবেক সরকারের বিভিন্ন বাহিনী নাটক মঞ্চস্থ করেছে। কিন্তু আমি আমার বাবাকে নিয়ে গর্বিত। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তিনি জীবনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন দেশের জন্য- দলের জন্য।’


২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় হারিছ চৌধুরীকে আসামি করা হয়। পরে সে মামলায় হারিছ চৌধুরীর যাবজ্জীবন সাজা হয়। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের আদালত। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ, এম, এস, কিবরিয়া হত্যা ও বিস্ফোরক মামলারও আসামি ছিলেন হারিছ চৌধুরী। ২১ আগস্ট হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় তিনি অভিযুক্ত হওয়ার পর ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি হয়। এই পরিস্থিতিতে হারিছ চৌধুরী দেশে না বিদেশে- তাঁর অবস্থান নিয়ে নানা খবর প্রকাশিত হয় দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। সেই রহস্য উদঘাটন হওয়ার আগেই খবর পাওয়া গেলো- করোনাসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন। তবে ভিন্ন পরিচয়ে।


এককালের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ সিলেটের সন্তান হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুরহস্য নিয়ে যখন দেশ-বিদেশ তোলপাড়- ঠিক তখন তাকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে মানবজমিন পত্রিকা। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়- হারিছ চৌধুরী আসলে মারা যাননি। মারা গেছেন মাহমুদুর রহমান। হারিছ চৌধুরী দীর্ঘ ১৪ বছর গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি ভারত কিংবা লন্ডনেও যাননি। বাংলাদেশের ভেতরেই ছিলেন এবং ঢাকাতেই বেশিরভাগ সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের পরপরই কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করেন। ঢাকায় আসার পর তিনি নাম বদল করেন। নাম রাখেন মাহমুদুর রহমান। দীর্ঘ ১৪ বছর এই নামেই পরিচিত ছিলেন। পরিচয় দিতেন একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে। ঢাকার পান্থপথে প্রায় ১১ বছর কাটিয়ে দেন এই পরিচয়ে। এই সময় তিনি মাহমুদুর রহমান নামে একটি পাসপোর্টও নেন। পাসপোর্ট নম্বর BW0952982। এতে ঠিকানা দেন শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। বাবার নাম আবদুল হাফিজ। ২০১৮ সনের ৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু হয়। পাসপোর্টে দেয়া ছবিতে দেখা যায় এ সময় তার চেহারায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। সাদা লম্বা দাড়ি। চুলের রঙ একদম সাদা। বয়সের ছাপ পরেছে। শুধু পাসপোর্ট নয় জাতীয় পরিচয় পত্রও পেয়ে যান মাহমুদুর রহমান নামে। তার এনআইডি নম্বর হচ্ছে ১৯৫৮৩৩৯৫০৭।


পাসপোর্ট  ও এনআইডি’র সূত্র ধরে মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। প্রায় দু’মাস অনুসন্ধানের পর জানতে পারা যায়, অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আলোচিত রাজনৈতিক নেতা হারিছ চৌধুরী। ঢাকায় কীভাবে ছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণও পাওয়া যায়- ঢাকার পান্থপথে একটি ভাড়া করা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকতেন। বাসা থেকে খুব একটা বের হতেন না। একজন কাজের বুয়া ও একটি ছেলে থাকতো তার সঙ্গে। বই পড়ে সময় কাটাতেন। নামাজ আদায় করতেন নিয়মিত। নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন।


ওই সময় এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সটির ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করি। তার সম্পর্কে  ব্যক্তিগত তথ্য খুব একটা জানতাম না। শুনেছি তার স্ত্রী ও সন্তানরা থাকেন লন্ডনে। কেউ কোন দিন আসেনি। আসা যাওয়ার সময় সালাম দিতাম। তিনি হাসি মুখে সালাম নিতেন। তাকে সবাই প্রফেসর সাহেব বলেই জানতো। নিঃসঙ্গ এই মানুষটির মৃত্যুও হয় নিঃসঙ্গতায়।


সাইফুল জানান, একদিন ভোর রাতে কেউ একজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শুনেছি হাসপাতালে থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর তার মেয়েকে দেখি। প্রথমে আমাদেরকে জানাতেও চাননি স্যার মারা গেছেন। মারা যাবার পর দুই মাস এই বাড়িতেই ছিলেন জামাইসহ। গত জানুয়ারিতে তারা বাসা ছেড়ে দেন। হারিছ চৌধুরী খুব একটা বের হতেন না। কথাও বলতেন না। এই বাসার সামনের একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতেন।


সেই ফার্মেসি সূত্রে জানা যায়, তিনি উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিক ও হৃদরোগের ওষুধ কিনতেন। ফার্মেসির মালিক সুমন খন্দকার বলেন, স্যার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। কখনো বাকিতে ওষুধ নিতেন না।


পাশেই একটি মুদি দোকান। এই দোকান থেকেই জিনিষপত্র কিনতেন। দোকানের মালিক মোহাম্মদ সুজন বলেন, তিনি তো খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সব সময় আমার দোকান থেকে চাল, ডাল, তেল এসব প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেন।


কীভাবে মারা গেলেন এবং কোথায় দাফন :
মাহমুদুর রহমান নামেই হাসপাতালে ভর্তি হন। দাফনও হয় এই নামে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। এর আগে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মারা যান ৩ সেপ্টেম্বর। ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়েছে- তিনি Covid with Septic Shock এ মারা গেছেন। তিনি প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব নূরের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর সার্টিফিকেট ইস্যু করেন সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আ, ক, ম, নূর।


হারিছ চৌধুরীর মৃতদেহ গ্রহণ করেন তার মেয়ে সামিরা চৌধুরী। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে গোসলের জন্য মোহাম্মদপুর নিয়ে যান। কাফনের কাপড় কেনেন মোহাম্মদপুরের মাইকআউস স্টোর থেকে। ওই সময় সামিরা জানান, প্রথমে কেউই করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ গোসল করাতে রাজি হয়নি। পরে যাই হোক রাজি হওয়ার পর গোসল সম্পন্ন হয়। দাফন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। কোথায় দাফন হবে। এরপর আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে সাভারে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। লাশ নিয়ে যাওয়া হয় সাভারের লালাবাদ কমলাপুরে। জামিয়ার কর্ণধার শাইখুল হাদিস আশিকুর রহমান কাশেমী সাহেব সম্মত হন। এরপর তাকে জামিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই দাফন করা হয়।


কেন এই গোপনীয়তা এবং লুকোচুরি জানতে চাইলে সামিরা চৌধুরী বলেন, ১৪ বছর যে মানুষটি আত্মগোপনে ছিলেন তার খবর প্রকাশ করা সহজ ছিল না। নানা ভয় আর আতঙ্ক কাজ করেছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি- অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আমার বাবা হারিছ চৌধুরী। ডিএনএ টেস্ট করলেই এটা খোলাসা হয়ে যাবে। জীবিত থাকা অবস্থায় আমি লন্ডন থেকে টেলিফোনে উনার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। আমার স্বামীও চার বছর আগে একবার ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা করে। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত আমার ভাই নায়েম শাফি চৌধুরীর সঙ্গে বাবার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সে ওই সময় সুইজারল্যান্ডে সিনিয়র এনার্জি এনালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলো। 


অনুসন্ধানে জানা যায়, হারিছ চৌধুরী দু’বার আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পরামর্শকরা এতে সায় দেননি।


হারিস চৌধুরী ১৯৫২ সালের ১ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার নানার বাড়ি ভারতের আসামে করিমগঞ্জ জেলার বদরপুরে। তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাশ করেন। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন হারিছ চৌধুরী।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডি.আর