পাঁচ আগস্ট পতন হয় টানা ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের। দুদিনের মাথায় গঠন হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর থেকে দেশের সব সেক্টরেই পরিবর্তন ও সংস্কারের আওয়াজ উঠে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর সাধারণ মানুষের চরম রোষাণলে পড়ে দেশের পুলিশ বাহিনী। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কর্মস্থলছাড়া ছিলেন তারা। সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে ১৬ আগস্ট থেকে ফের কাজে যোগ দিতে শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রধান বাহিনীকে কলঙ্কমুক্ত করতে ও জনরোষ থেকে বাঁচাতে আইজিপিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পদে হয় পরিবর্তন। এরই ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকালীন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার জাকির হোসেন খান (পিপিএম- সেবা)-কে বদলি করা হয়েছে অন্যত্র। তাঁর চেয়ারে বসেছেন পুলিশের চৌকস কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম (পিপিএম- সেবা)। আগে তিনি অ্যাডিশনাল ডিআইজি হিসেবে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এর আগে ছিলেন ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপার। ডিআইজি হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে রেজাউল করিম হয়েছেন এসএমপি কমিশনার। দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ৫ সেপ্টেম্বর।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিলেট মহানগরে শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন এসএমপি কমিশনারের সামনে রয়েছে মূল ৬টি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে- পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি, পুলিশি কার্যক্রম গতিশীল করা, হকার ও যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং অসময়ে মহানগরে ট্রাক চলাচল বন্ধ করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত নিষিদ্ধ রিকশা চলাচল বন্ধ করা, চোরাচালানের মূল হোতাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং মাদকদ্রব্য কেনা-বেচা-সেবন ও জুয়া-পতিতাবৃত্তি বন্ধ করা। বিষয়গুলো নিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শীর্ষ পাঠকপ্রিয়- নিজন্ধিত নিউজ পোর্টাল সিলেটভিউ২৪ডটকম-এ একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মো. রেজাউল করিম। দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেছেন ইতোমধ্যে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত এবং নানা পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সিলেটভিউ’র নিউজ ইনচার্জ মো. রেজাউল হক ডালিম। ক্যামেরায় ছিলেন স্টাফ ফটো সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম সবুজ। সিলেটভিউ’র পাঠকদের জন্য আজকে প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারের ১ম পর্ব।
সিলেটভিউ : এসএমপি’র দায়িত্ব নিয়েছেন দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে। আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে সিলেটেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হয়েছে পুলিশ বাহিনী। তাই ৫ আগস্টের পর বেশি জনরোষে পড়ে এ বাহিনীর সদস্যরা। এমতাবস্থায় সিলেট মহানগরে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এবং পুলিশের প্রতি নগরবাসীর আস্থা ফেরাতে আপনার বিশেষ কৌশল বা পদক্ষেপ কী?
এসএমপি কমিশনার : বর্তমান পরিস্থিতিতে পূণ্যভূমি সিলেটে দায়িত্ব পালন শুরু করেছি আমি। দায়িত্ব নেওয়ার পরই এসএমপি’র সকল ফোর্স অফিসারদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাদের মনোবল বাড়াতে চেষ্টা করেছি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোথাও কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে না- এমন পরিবেশ সর্বত্র তৈরির চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। পুলিশ সদস্যরা আগের চাইতে এখন বেশ স্বাচ্ছ্যন্দে মাঠে কাজ করছেন। মানুষের আস্থা যাতে পুলিশের প্রতি পুরোপুরি ফিরে আসে সেই লক্ষ্যেও আমরা কাজ করছি। পুলিশ যেহেতু জনসম্পৃক্ত বাহিনী। তাই সিলেটের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমরা ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করছি। পুলিশকে পুরোপুরি সিলেট মহানগরবাসীর আস্থাশীল করতে কমিউনিটি ও বিট পুলিশিংয়ের সব ধারনা বা পরিকল্পনা জোরদারভাবে বাস্তবায়ন করবো আমরা। জন-আকাঙ্খা পুরণে আমরা সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সিলেটের স্টেক হোল্টারদের সঙ্গে মতিবিনময় করছি। দৃঢ় বিশ্বাস- আমরা সবাই মিলে শীঘ্রই সিলেটকে পুরোপুরি সুশৃঙ্খল, সুন্দর ও শান্তির মহানগর হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।

সিলেটভিউ : পুলিশ এবং অপরাধ- এই দুটি শব্দ কোনো অবস্থাতেই একসঙ্গে যায় না। তবুও বিগত সময়ে আমরা দেখেছি সিলেটে পুলিশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে। বিশেষ করে দেশ-বিদেশে আলোচিত সিলেটের যুবক রায়হান আহত হত্যাকাণ্ড; সাম্প্রতিক সময়ে চোরাচালানসহ বিভিন্ন বিষয়। সিলেটের পুলিশকে বিতর্কমুক্ত রাখতে আপনার ভূমিকা কী থাকছে?
এসএমপি কমিশনার : একটি স্পষ্ট কথা- অপরাধী অপরাধী-ই। সে যেই হোক না কেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা পুলিশের কোনো সদস্য যাতে কোনো অনৈতিক কাজের সঙ্গে না জড়ায়- সে বিষয়ে সদা মনিটরিং করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় ফোর্স অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে। মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ কর্তৃক কেউ কোনো হয়রানির শিকার হলে সেই সেলে এসে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারবেন। আমরা তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এছাড়া পুলিশের প্রচলিত আইনের পাশাপাশি যত প্রবিধান আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। পুলিশ যাতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারে সেদিকে আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে।
সিলেটভিউ : সিলেট মহানগরের সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে- হকার কর্তৃক ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং যত্র-তত্র যানবাহন স্ট্যান্ড। এই দুই কারণে দিন-রাত সড়কে লেগে থাকে যানজট, ফুটপাত দিয়ে চলাচলে মানুষের হয় চরম ভোগান্তি। বিগত সময়গুলোতে দেখা গেছে- পুলিশ ও সিলেট সিটি করপোরেশন বার বার যৌথভাবে অভিযান চালিয়েও তাদের উচ্ছেদ করা যায়নি। এখনো এমন চিত্র মহানগরে বিদ্যমান। এই অবস্থায় আপনার নেতৃত্বে হকার ও যানবাহন উচ্ছেদে কার্যকর কী পদক্ষেপ নিবে এসএমপি?
এসএমপি কমিশনার : এই দুই বড় সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন, বিআরটিএ-সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছি। বৈঠকে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সড়ক ও ফুটপাত থেকে ভ্রাম্যমাণ দোকান এবং গাড়ি স্ট্যান্ড সরিয়ে নিতে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো হবে। এছাড়া কাগজপত্রবিহীন অবৈধ যানবাহনও সড়ক থেকে সরাতে এই ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। আশার করছি- সংশ্লিষ্ট সবাই পুলিশকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবেন এই বিষয়ে। কারণ- সিলেট আমাদের সবার। নিজেদের শহরকে নিজেরাই পরিপাটি রাখতে হবে। নির্দেশনা না মানলে ৭ দিন পর থেকে কঠোর অভিযানে নামবে এসএমপি’র ট্রাফিক পুলিশ।
(সাক্ষাৎকারটির আরও দুই পর্ব রয়েছে। পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায়। থাকুন আপনার প্রিয় নিউজ পোর্টাল সিলেটভিউ-এর সঙ্গে।)
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডি.আর
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.