প্রকাশিত: ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ ১২:৪৭ (বৃহস্পতিবার)
বিপিএল: অনিয়মের নিয়ম!

বিপিএল শেষ করলো তার আরেকটি আসর। এবং যথারীতি ‘নিয়ম’ মেনেই শেষ হয়েছে আসরটি। যদিও এই নিয়ম আসলে অনিয়মের!

বিপিএল মানে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। আর ক্রিকেটের ন্যুনতম খোঁজখবর রাখেন এমন সবাই-ই জানেন, বিপিএল মানে বিতর্ক, অনিয়ম! এবারসহ এগারোটি আসরেই প্রায় নিয়মিতভাবেই এসব অনিয়ম হয়ে আসছে।

একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে, অভাবনীয় এক সময়কে সঙ্গী করে বসেছিল বিপিএলের এবারের আসর। বদলের সুর, বদলে দেওয়ার সুর শোনা গেছে আসর শুরুর আগে। পরিবর্তনের ঢেউয়ে অতীতের সমস্ত অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ভেসে যাবে—এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। ক্রিকেটপ্রেমী জনমানসেও ছিল বিতর্কহীন ক্যানভাসে আঁকা পরিচ্ছন্ন একটি বিপিএলের ছবি। কিন্তু দিনশেষে যে হাড্ডিসার চিত্র বেরিয়ে এলো, তাতে এবারই সবচেয়ে বাজে আয়োজন হলো কিনা সেই প্রশ্নও ওঠেছে!

২০১২ সালে যাত্রা বিপিএলের। বিভিন্ন কারণে ২০১৩ এবং ২০১৮ সালে মাঠে গড়ায়নি টুর্নামেন্টটি। এবার শেষ হয়েছে একাদশতম আসর। বিপিএল যখন শুরু হয়, তখন বৈশ্বিক ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বলতে কেবলমাত্র ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল ছিল। বিগব্যাশও কেবলমাত্র শুরু হয়েছে তখন। এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই আছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এমনকি সহযোগী অনেক দেশেও নিয়মিত বসছে টি-২০’র জমকালো আসর। বিপিএলের পরে শুরু হওয়া সেইসব আসর ক্রিকেটারদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, লোভনীয় পারিশ্রমিক, আয়োজনে নতুনত্ব, সম্প্রচারে প্রতিবার ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, আয়োজকদের পেশাদারিত্ব, ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকপক্ষের আন্তরিকতা—সবমিলিয়ে ওইসব আসরগুলো নিজেদের অবস্থানকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুসংহত করেছে। বিপিএলের ক্ষেত্রেও তো এরকমই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো উল্টোটা!

ভারতের ক্রিকেটের সাথে অন্যদের তুলনা না করাই ভালো। আর্থিক মানদন্ডে গোটা বিশ্বের ক্রিকেটের যে মূল্য, এক ভারতেই এরচেয়ে বেশি। আবেগ, উন্মাদনা, দর্শক—এসবক্ষেত্রেও ভারতের ক্রিকেট যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে। তাই দেশটির তুমুল জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সাথে এরকম অন্য কোনো টুর্নামেন্টের তুলনা করাও বৃথা। আইপিএলে খেলার জন্য জাতীয় দলও ছেড়ে দেন অনেক ক্রিকেটার, এমনই এর ক্রেজ! বাংলাদেশের বিপিএল সেরকম হবে, মানে আইপিএলের পর্যায়ে থাকবে—এমন স্বপ্ন বাস্তবিকই দেখা উচিত নয়। সেই সক্ষমতা, সামর্থ্য ভারতের চেয়ে বহুগুণে ছোট্ট এই দেশের নেই। কিন্তু আইপিএলের পরে দুনিয়ার দ্বিতীয় সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তো ছিল বিপিএলের! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আগেকার পরিষদের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলতেন, বিপিএল হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সেরা। আদতে এই দাবি ছিল হাস্যকর। এই দাবি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ছিল পুরোটাই, কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয়েছে। কিংবা ফিকে করে দেওয়া হয়েছে!

আইপিএল বাদ। অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ, পাকিস্তানের পিএসএল এগুলো থেকেও কেন পিছিয়ে বিপিএল? ভারত বাদে তো ক্রিকেটাবেগ, ক্রিকেটপ্রেম এসবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের ব্যবধান তো বেশি না। বিপিএলের কয়েক বছর পরে, ২০১৬ সালে শুরু হওয়া পিএসএলও এখন বিপিএলকে টপকে গেছে! এবং ক্রমেই এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের আবেদন বাড়ছেই। আবেদন বাড়ানো, অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ ছিল বিপিএলের সামনেও। কিন্তু শুরু থেকেই একের পর এক বিতর্ক, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এই টুর্নামেন্টকে অনুজ্জ্বল করে দিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবিতেও খোলনলচে বদল এসেছে। এবং যারা দায়িত্বে এসেছেন, তারাও সাহসের সঙ্গে বিপিএলের একাদশতম আসরকে সাজানো, গোছানো, পরিচ্ছন্ন হিসেবে উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না, এমনটা বলাই যায়। কিন্তু শেষমেশ তারা বিতর্কহীন বিপিএল উপহার দিতে পারেননি। এক দুর্বার রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি এবার যেসব কাণ্ড ঘটিয়েছে, তাতেই কালি লেপ্টে গেছে বিপিএলে। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক না দেওয়া, ক্রিকেটারদের অনুশীলন বর্জন, বিদেশি ক্রিকেটারদের ছাড়াই ম্যাচ খেলতে নামা, হোটেল বিল পরিশোধ করতে না পারা—হেন কিছু নেই যা করেনি দুর্বার রাজশাহী। নতুন মালিকানায় নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিল তারা। কিন্তু এই দুর্বল ফ্র্যাঞ্চাইজির কারণে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে এবারের আসরকে। দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচনা হয়েছে বিপিএলকে ঘিরে। এমনকি ক্রিকেটারদের বৈশ্বিক সংগঠনও বিবৃতি দিয়েছে। অথচ বিপিএলের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব প্রত্যেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজিরও। বিসিবির যেমন দায় আছে, তেমনি ফ্র্যাঞ্চাইজিদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু দুর্বার রাজশাহীর মতো দুর্বল, অপেশাদার ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের উজ্জ্বলতাকেই কেবল কমাতে ভূমিকা রাখে।

এবার ফিক্সিং কাণ্ড নিয়েও বেশ সমালোচিত হয়েছে বিপিএল। কয়েকটি ম্যাচে যেসব দৃশ্য দেখা গেছে খালি চোখেই, তাতে ফিক্সিংয়ের দুর্গন্ধই কেবল ছড়িয়েছে। ইয়া বড় নো বল, ক্রিজের বাইরে বোলিং করে অবিশ্বাস্য ওয়াইড, ব্যাটারের আউট হওয়ার ধরন—অনেক কিছুই ছিল সন্দেহজনক। টিকিট কালোবাজারি, মাঠের অব্যবস্থাপনা এসবও বিতর্ক বাড়িয়েছে কেবল। বিপিএলের প্রাইজমানি নিয়েও কথা হয়েছে অনেক। আগে চ্যাম্পিয়নরা পেত মাত্র ১ কোটি টাকা, রানার্সআপ ৫০ লাখ। এবারের আসরে প্রাইজমানি দ্বিগুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে যথাক্রমে ২ কোটি টাকা ও ১ কোটি টাকা। কিন্তু তারপরও তো কথা থেকে যায়! এবার বিপিএলে উদ্বোধনীয় অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের সংগীত তারকা রাহাত ফতেহ আলী খানকে সম্মানী বাবদ ৩ কোটি টাকা ২০ লাখ টাকা দেয় বিসিবি। আপনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একজনকেই যদি এতো টাকা দিতে পারেন, তবে একটা আসরের চ্যাম্পিয়ন দলকে কেন এতো কম পারিশ্রমিক দেবেন! আসরকে আকর্ষণীয় করতে, তারকা ক্রিকেটারদের টানতে যেখানে প্রাইজমানি ইতিবাচক কাজ করতে পারে এবং আপনি সে পথে হাঁটছেন না, সেখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এতো খরচ তো অপব্যয় হিসেবে আখ্যা পাবে! এবারের আসরে কিছু হাস্যকর ভুলও দেখা গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ মীর মুগ্ধ স্মরণে গ্যালারিতে দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে পানির ব্যবস্থা করার বিষয়টি জানানোর জন্য বিসিবির পক্ষ থেকে যে সংবাদ সম্মেলন করা হয়, সেটির ব্যানারে লিখা ছিল ‘২৯ ডিসেম্বর ২০২৫’। অথচ তখনও ২০২৫ সাল শুরুই হয়নি! উদ্বোধনী ম্যাচেই একটি দলের অধিনায়ক অনুশীলনের জার্সি পরে হাজির হয়ে যান টসে! আরেকটি দলের ক্রিকেটারদের পুরনো হেলমেট ও প্যাডে কাপড় পেছিয়ে খেলতে দেখা গেছে!

পটপরিবর্তনের একটা কঠিন সময়ে বিপিএলের আয়োজন নিয়ে শঙ্কা ছিল। বিসিবির নতুন নেতৃত্বের আন্তরিকতায় সেই শঙ্কা উবে যায়, মাঠে গড়ায় আসর। এবারের পিচ ছিল স্পোর্টিং। যথেষ্ট রান হয়েছে, রেকর্ডও হয়েছে। গ্যালারিতে দর্শকও ছিল ব্যাপক। এসবকিছুর জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারে বিসিবি। তবে যেসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ম্লান করেছে বিপিএলকে। আশার কথা যে সংশ্লিষ্টরা বিতর্কের দায় এড়িয়ে যাননি, তারা স্বীকার করেছেন। সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আগামী বিপিএল আয়োজনের জন্য ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কথা ভাবছে বিসিবি, যাতে এই টুর্নামেন্টের সময়ে অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট না থাকে। বিদেশি ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক জটিলতা এড়াতেও ব্যবস্থা নিচ্ছে বিসিবি। বিদেশিদের পারিশ্রমিকের প্রাপ্যতা, লজিস্টিক্যাল সহায়তায় বিসিবি সরাসরি কাজ করার কথা জানিয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও নিয়ন্ত্রিত ও উন্নত আর্থিক প্রটোকল নিশ্চিত করতে চায় বিসিবি। ফিক্সিংয়ের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে তারা। এবারের আসরে ফিক্সিংয়ের কালো থাবা ছিল কিনা, তা বের করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিসিবি। এর নেতৃত্বে আছেন একজন সাবেক বিচারপতি। এই কমিটি এক মাস সময় পাচ্ছে তদন্তে। এর বাইরে বিপিএলে পারিশ্রমিক সমস্যাসহ সবকিছু খতিয়ে দেখতে একটি সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এখান থেকে যেসব সমস্যার কথা ওঠে আসবে, সেগুলো শোধরানের চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়া।

ভুল হবে না, এরকম নয়। কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই ভুলের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সেটা নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিপিএল এ দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ও জমকালো আসর। দেশ-বিদেশের লাখো-কোটি চোখ এই টুর্নামেন্টের দিকে চেয়ে থাকে। এই একটি টুর্নামেন্ট দিয়েই বৈশ্বিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সম্মান বাড়ানো যায়, সমীহ আদায় করা যায়। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা।

ফাগুনের এই আগুনা রাঙা বসন্তে, রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের শক্তির বলে আশা প্রকাশ করা যেতেই পারে—‘আসছে বছর বিপিএল হবে দ্বিগুণ জৌলসময়’।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে