প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৫ ১৩:০৬ (বৃহস্পতিবার)
আধুনিকতার মুখোশে নৈতিকতা হুমকির মুখে

নৈতিকতা হচ্ছে মানুষের আচরণ,দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের ভিত্তি। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ন্যায়-অন্যায়,ভাল-মন্দের পার্থক্য ভুলে যায় তখনই শুরু হয় নৈতিক অবক্ষয়।আর এই নৈতিক অবক্ষয় যখন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি,পরিবার থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটাই রূপ নেয় সামাজিক অবক্ষয়ে।

 

দিনকে দিন আমাদের সমাজে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।এখন ভাইরাল হওয়াটাই যেন জীবনের বড় সাফল্য। অশালীন টিকটক, রিলস বা কাপল ব্লগ সবই ভাইরাল হওয়ার নামে করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের অনেকেই ‘সেলিব্রিটি’ তকমা পেয়ে যাচ্ছেন।

 

কারণ সিস্টেমটাই এমন যে যাই করুক, দর্শক মিলবে। কেউ পছন্দ করে দেখবে, কেউ ঘৃণা নিয়ে। তবুও দেখবে। ফলে ব্যবসা চলবে। এই ট্রেন্ড দেখে আরও অনেকে বিতর্কিত কনটেন্ট তৈরিতে উৎসাহিত হচ্ছে। 

 

শরীর প্রদর্শন, অশালীনতা, নকল আধুনিকতা এসব যেন এখন ‘স্মার্টনেস’-এর মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে বহু বৈচিত্র্যময় কাপড়ের প্রচলন আছে, যেগুলো আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অঞ্চলভেদে আলাদা পরিচিতি বহন করে। কিন্তু আজকাল অনেকেই আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি ভুলে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ফ্যাশনকে অন্ধভাবে অনুসরণ করছে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়তে যেন অনেকেরই ‘লজ্জা’ লাগে। অথচ পশ্চিমারা তাদের ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে বহন করে। নিজেকে আধুনিক প্রমান করতে অনেকেই এ কাজ করছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি "Dress doesn’t make one great"—পোশাক নয়,মানুষের মানসিকতা,মূল্যবোধ আর আচরণই মানুষকে মহান করে তোলে। সত্যিকার আধুনিকতা মানে প্রযুক্তিতে দক্ষতা,মূল্যবোধে দৃঢ়তা ও মানবিকতায় অগ্রসর হওয়া।

 

একইভাবে ফ্যাশনের নামে ধূমপান ও মাদকের মতো ভয়ংকর অভ্যাসকেও তরুণরা স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে। সাময়িক মজা বা বন্ধুদের প্রভাবে মাদক সেবন শুরু করে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আসক্তিতে ডুবে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যার ৮০% তরুণ।এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তি নয় পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে।ন্যায়ের বদলে তামাশা,আদর্শের বদলে বিতর্ক এই অদ্ভুত রূচির পরিবর্তনই সামাজিক অবক্ষয়ের মূল।

 

এখনই সময় সচেতন হওয়ার।পরিবারকে রাখতে হবে প্রথম দায়িত্বে সন্তান কী দেখছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে তা নজরে রাখা জরুরি।একইসঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও নিতে হবে কার্যকর ভূমিকা।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  মাদকবিরোধী ডোপ টেস্ট চালু করা,অশ্লীল কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ইতিবাচক কনটেন্টকে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।সবশেষে, নৈতিক অবক্ষয় রোধে চাই পারিবারিক শিক্ষা,ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, এবং সৎ মানুষের সামাজিক স্বীকৃতি।আদর্শ ও বিবেকের জায়গা থেকে পথচলা শুরু করলেই এই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

 

 

 

লেখক:
আরিফ রশিদ (শিক্ষার্থী) 
আইন ও বিচার বিভাগ
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট