প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৫ ০০:৩৩ (বৃহস্পতিবার)
টেস্টের জয়গান

এখনকার ক্রিকেট মাঠ যেন এক বিশাল মেলা। চারদিকে রঙের ঝলকানি, ডিজে মিউজিক, তারকাদের উপস্থিতি, চার-ছক্কার ফুলঝুরি—সবমিলিয়ে ক্রিকেট যেন এক সাড়ম্বরপূর্ণ সার্কাস। এই সার্কাসের সিংহভাগ অংশজুড়েই আধিপত্য টি-টোয়েন্টির। দ্রুত ফলাফল, চটকদার বিনোদন আর সেকেন্ডে সেকেন্ডে উত্তেজনার খোঁজে দর্শকস্রোতও টি-টোয়েন্টির দিকে। একশ’ বিশ বলের এই বিনোদনের ছোঁয়া বেশ ভালোমতোই স্পর্শ করেছে ওয়ানডে ক্রিকেটকেও। টি-টোয়েন্টির মারকাটারি ব্যাটিং তাই হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে এই ফরম্যাটেও। তবুও তাল মেলানোর সুযোগ কই! রকেট গতিতে ছোটা টি-টোয়েন্টির নাগাল বুলেট গতিতে ছোটা ওয়ানডে পাবে কি করে! আর টেস্ট? বুক ঠেলে উত্থলে ওঠা আবেগ বলে—আহা!

টেস্ট ক্রিকেট কখনোই ফ্যাশন ছিল না, বরঞ্চ এটা চিরকালীন ঐতিহ্য। কিন্তু ঝটপট বিনোদনের সার্কাসে ঐতিহ্য ক্রমেই ফিকে হচ্ছে। ধৈর্য্যরে পরীক্ষা নেওয়ার অমর ধারাটি হয়ে পড়ছে কোণঠাসা। এই কঠিন সময়ে অতিসম্প্রতি শেষ হওয়া ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজ যেন টেস্ট ক্রিকেটের জয়গানই গেয়ে গেল। টেস্টের গায়ে ‘বিরক্তিকর’ ‘ধীরগতির’ যে তকমা হররোজ সেঁটে দেওয়া হয়, সেসব ঠেলে যেন সিরিজটি দেখিয়ে দিল—টেস্ট এখনও রক্তে আগুন ধরাতে পারে। গ্যালারিভর্তি দশখ, টিভি পর্দায় লক্ষ চোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ—সবমিলিয়ে যেন নতুন করে ফিরলো সাদাপোশাকের আবেদন।

সুন্দরের পুঁজারি কেউ কেউ হয়। আর ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য তো টেস্ট ম্যাচেই। উতাল-পাতাল ব্যাটিংয়ের যুগে এসেও সেই পুঁজারিরা ঐতিহ্যের ডাক এড়াতে পারেন না। বস্তুত টেস্ট ম্যাচের প্রতিটা সেশন যেন একেকটা যুদ্ধক্ষেত্র। নিখুঁত পরিকল্পনা, ধৈর্য্য, মস্তিষ্কের খাটনি, পিচের চরিত্র, আবহাওয়ার ধরন—পাঁচদিনের ‘পানিপথের যুদ্ধ’ হচ্ছে টেস্ট। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শর্টকাটে আপনি ফল পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু ঐতিহ্যের ক্রিকেটে শর্টকাট বলে কোনো রাস্তা নেই, এখানে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগ নেই। শরীর-মন-পরিকল্পনা-দৃঢ়তা-বাস্তবায়ন এসবকিছুর মিলন টেস্ট। টি-টোয়েন্টি কিংবা ওয়ানডেতে ‘ফ্লুক’ শব্দটা অহরহ শুনতে পাবেন। কিন্তু টেস্টে থাকতে হয় ‘ক্লাস’। ব্রায়ান লারা, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষণ, মুত্তিয়া মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন—এসব গ্রেটদের মানুষ মনে রেখেছে সেই ক্লাসের কারণেই। ‘ফ্লুকওয়ালারা’ হারিয়ে যান সময়ের গহীন গহ্বরে; ‘ক্লাসওয়ালারা’ সুবাস ছড়িয়ে পান ক্লাসিকের মর্যাদা।

দুই.
এবারের ইংলিশ সামারে পাঁচ ম্যাচের সিরিজের যে দৃশ্যপট, তা যেন ক্লাসিক টেস্ট ক্রিকেটেরই প্রতিচ্ছবি। হেডিংলি, এজবাস্টন, লর্ডস, ওভাল আর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডÑপাঁচ ভেন্যুতে যেন পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাস রচিত হলো। প্রেম, প্রতারণা, যুদ্ধ, প্রতিশোধ, বীরত্ব—সবকিছুর মিশেলে যেন মহাকাব্য। কখনো ইংল্যান্ডের লড়াকু ব্যাটিং, জবাবে ভারতের চোয়ালবদ্ধ বোলিং, কখনো ভারতের তরুণ তুর্কিদের ব্যাটের শাসন, এর পাল্টায় ইংলিশদের শাণিত বলের তোপ, সঙ্গে প্রায় প্রতি সেশনে ঘন ঘন মোড় বদল, চিত্র পরিবর্তন পুরো সিরিজকে দিয়েছে অমিয় সুধার স্বাদ।
ব্যাটে-বলের লড়াই চাপিয়ে সিরিজটি যেন ইংল্যান্ডের কাছে ছিল সেই চিরায়ত অহমের ঝান্ডা তুলে ধরার সুযোগ; আর ভারতের কাছে যেন দীর্ঘ দুঃশাসনের জবাব দেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার। আর তাই তো ভাঙা কাঁধ নিয়ে এক হাতেই ব্যাট নিয়ে বাইশ গজে নেমে পড়েন ক্রিস ওকস। পায়ে গুরুতর চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার পরও ফিরে আসেন রিশভ পন্ত, তুলেন ঝড়। লর্ডসে যে মোহাম্মদ সিরাজের দুর্ভাগ্যজনক আউটে হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ভারত, ওভালে এসে সেই সিরাজের রুদ্ররূপে দুরন্ত জয়ের রূপকথা লিখে ভারত। যেন ‘নবাব’ সিরাজের ছোবলে ইংরেজদের দুর্গ পতন!

বীরত্বের লড়াই ছাপিয়ে ইংরেজ অহমের চিত্রও দেখা গেল ‘স্বগৌরবে’! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যাচ হারের খাদে ছিল ভারত। সেখান থেকে তারা ঘুরে দাঁড়ায় রবীন্দ্র জাদেজা ও ওয়াশিংটন সুন্দরের ব্যাটে। শেষ দিনে ম্যাচের ফল যখন নিশ্চিত ড্রয়ের দিকেই গড়াচ্ছে, তখন আগেভাগেই ড্র মেনে নিয়ে ম্যাচ শেষের প্রস্তাব দেন ইংলিশ দলপতি বেন স্টোকস। কিন্তু ৮৯ রানে থাকা জাদেজা ও ৮০ রানে থাকা সুন্দর কেন তা মানবেন! তাদের সামনে সেঞ্চুরির হাতছানি; স্টোকসের প্রস্তাব তাই খারিজ হয়ে গেল। চটে গেলেন স্টোকস, তার যেন অহমে আঘাত লাগলো। এর পরের দৃশ্য সেই চটে যাওয়ার প্রতিবিম্ব—জাদেজা ও সুন্দরকে বোলিং করলেন ব্যাটার হ্যারি ব্রুক আর জো রুট! আলোচিত সিরিজে এও ছিল আরেক আলোচনার খোরাক। আবার লর্ডসে জ্যাক ক্রলির সময়ক্ষেপণে ক্ষুব্ধ হয়ে শুবমান গিলের বাদানুবাদও ছিল ট্রেন্ডিংয়ে।

মাঠের ক্রিকেটই কেবল আলোচিত চরিত্র ছিল? মোটেও না। দর্শকদের জন্য ‘থ্রিলিং’ হয়ে ছিল মাঠের বাইরের ঘটনাও। এই যেমন ওভালে শেষ ম্যাচের আগে পিচ কিউরেটর লি ফোর্টিসের সঙ্গে ভারত কোচ গৌতম গম্ভীরের বাগবিতণ্ডা ছিল ‘হটকেক’। ওই ওভাল টেস্ট আসলে ছিল ব্যাটে-বলের দুর্দান্ত লড়াইয়ের এক সিরিজের কাব্যিক সমাপ্তি। টেস্টে শেষ ইনিংসে ৩৮০ রান তাড়া সহজ কিছু নয়। অথচ ইংলিশ ব্যাটাররা সে লক্ষ্য তাড়ায় ব্যাট চালাচ্ছিলেন অবলীলায়। একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল চতুর্থ দিনেই তারা জয় তুলে নেবে। কিন্তু চিত্রনাট্যের শেষটা তো তখনও বাকি! শেষদিনে হাতে ৪ উইকেট নিয়ে স্টোকসের দলের প্রয়োজন ছিল ৩৫ রান। হাতের মুঠোয় জয়। কিন্তু টেস্টের শাশ্বত রূপ বদলের খেলায় সেই জয় বেরিয়ে গেল মুঠো থেকে; পরাজয়ের পতন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকলো তাদের ইংলিশদের কাছে। বিপরীতে মোহাম্মদ সিরাজ নামক কামানের গোলায় ইংরেজদের ধসিয়ে দেওয়া ভারত শিবিরে উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাস। পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচও যে উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বে চড়িয়ে দিতে পারে, এ যেন তারই নাটকীয় প্রকাশ।

তিন.
ক্রিকেটকে ক্রমেই বিপণনের হাতিয়ার বানাতে গিয়ে দেশে দেশে, এমনকি শহরে শহরে এখন টি-টোয়েন্টি লিগের পসরা! এতো বেশি প্রতিযোগিতা যে ভালোমানের ক্রিকেটারদের দিয়ে কোটা পূরণ হচ্ছে না। আর তাই অখ্যাত ক্রিকেটারদের দেখা মিলছে হররোজ; যাদের সিংহভাগই হারিয়ে যাচ্ছেন দ্রুত।

আজকাল টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও গ্যালারি পুরোটা ভরে না। দর্শক কতো খেলা দেখবে! এই যখন পরিস্থিতি, তখন টেস্ট তার চিরায়ত রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে দর্শক আগ্রহ। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের কেবল ওভাল টেস্টের শেষ দিনের কথাই যদি বলা হয়, ২৬ হাজার ৫০০ দর্শক টিকিট কেটে গ্যালারিতে ছিলেন! এই সিরিজ টিভির পর্দায় দেখেছেন প্রায় ৪ কোটি মানুষ! এ যেন দৃঢ় স্টেটমেন্ট—টেস্ট ক্রিকেটের আবেদনের নবতর উত্থান!

বস্তুত টেস্ট ক্রিকেট প্রত্নতাত্ত্বিক খননযজ্ঞের মতো। এখানে আনন্দ পাওয়া যায় ধৈর্য্যে। এখানে নায়ক হয়ে ওঠেন তারাই, যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা উইকেটে পড়ে থাকেন, যারা পরিশ্রান্ত হয়েও উইকেটের নেশায় বল ফেলেন নিশানায় স্পেলের পর স্পেল। টেস্ট বুমবুম ক্রিকেট নয়, বরঞ্চ বাছবিচারের খেলা। এখানে একেকটি বল একেকটি প্রশ্নপত্র, যার উত্তর ব্যাটারকে দিতে হয় নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে, কৌশলে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে হয়তো প্রতিভার ঝলক দেখা যায়, কিন্তু সাদাপোশাকের ক্রিকেটে বেরিয়ে আসে একজন খেলোয়াড়ের দৃঢ়তার প্রতিচ্ছায়া।

চার.
এবারের ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজ দেখিয়েছে, রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা, টানটান বিনোদনের জন্য কেবল তিন বা ছয় ঘন্টার ম্যাচই নয়, পাঁচদিনের ম্যাচও যথেষ্ট পসরা সাজিয়ে বসে থাকে। দুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল, ক্রিকেটারদের লড়াকু মনোভাব, কিছু নাটকীয় মুহুর্ত, ক্রিকেটবোদ্ধাদের নিবেদন, অনিশ্চয়তার দোলাচলে থাকা ফলাফল—ব্যস, আর কী চাই! টেস্ট ক্রিকেটে এসবের সম্মিলনে তৈরি হয় এমন অভিজ্ঞতার, যা শত চার-ছয়ের মারকাটারি থেকেও বেশি মনে গেঁথে থাকে।

তবে টেস্ট ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখতে কেবল ম্যাচ আয়োজন করে গেলেই চলবে না। এর উপস্থাপনায় বদল আনতে হবে। কূটিলতার পথে না হেঁটে উদারতার পথে আগাতে হবে নিয়ন্ত্রকদের। দ্বিস্তরের টেস্ট পদ্ধতি এই ফরম্যাটের জন্য আত্মঘাতী হওয়ার শঙ্কা তৈরি করবে। তিন-চারটি দেশ কেবল নিজেদের মধ্যে টেস্ট খেলছে, এই দৃশ্য দর্শককে কতোটা টানবে? কতোটা আগ্রহ ধরে রাখবে তাদের? বরঞ্চ টেস্টের ছায়াতল কিভাবে বিস্তৃত করা যায়, আরও দেশকে কিভাবে এই ফরম্যাটের সাথে খাপ খাওয়ানো যায়, সেই চিন্তা করা উচিত। দর্শকদের কথা গভীর মনোযোগে ভাবতে হবে। এখনকার আধুনিক দর্শকদের কেবল ম্যাচের চিত্র দেখে মন ভরে না। তাদের চাই তথ্য, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ। চাই প্রযুক্তির ব্যবহারে স্পষ্টতা, ধারাভাষ্যে নাটকীয়তা। সর্বোপরি বোর্ডগুলোর আন্তরিকতাও জরুরি। কথিত দেশপ্রেমের ভাঁওতাবাজির ধোয়া তোলে অমুক দেশে খেলবো না, তমুক দেশে যাবো না এই সীমাবদ্ধ মনোভাব থেকে বোর্ডগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভেবে দেখুন, ভারত পাকিস্তান বা পাকিস্তান ভারত সফরে গিয়ে খেলছে, অ্যাশেজের উত্তেজনাকে ছাড়িয়ে যাবে না?

নদীর যেমন বাঁকে বাঁকে ছন্দ, টেস্টেরও সেশনে সেশনেও তেমনি ভিন্ন গল্প। টেস্টের জয়গান তাই অবিসংবাদিত।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে