প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২১:০৬ (শুক্রবার)
আবারো কোটা: শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ কি তবে অবমূল্যায়িত?

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণ ইতিহাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সবসময়ই পরিবর্তনের বার্তা বয়ে এনেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তরুণ প্রজন্ম বুক পেতে দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, এমনকি জীবন দিয়েছে। ঠিক গত বছরের জুলাই মাসেও রাষ্ট্রযন্ত্র তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে ওঠা কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যাশায়, যেখানে মেধা ও যোগ্যতাই হবে রাষ্ট্রীয় নিয়োগের মূল মাপকাঠি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই আন্দোলনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর তাজা প্রাণ ঝরার পরও আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোটা প্রথা আবারও নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি আবারও কোটা চালু করা হয়েছে, যদিও তা অনেক সময় ভিন্ন নামে বা পরোক্ষভাবে কার্যকর হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে শিক্ষাঙ্গণে বৈষম্য ফিরিয়ে আনার এক ধরনের চেষ্টা। শিক্ষার্থীরা যে স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছে, সেই স্বপ্নকে এভাবে ভঙ্গ করা রাষ্ট্রের জন্য কেবল লজ্জাজনকই নয়, বরং একটি ভয়াবহ বৈষম্যও বটে। কারণ এই সিদ্ধান্ত জেন-জিদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে তাদের আত্মত্যাগ, তাদের রক্তের মূল্য রাষ্ট্র তেমন কিছুই মনে করে না।

কোটা সিস্টেম বিলোপ করতে যে সকল শিক্ষক-কর্মকর্তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংহতি জানিয়েছিল সেইসব ব্যক্তিরাই আজ ক্ষমতার চেয়ারে বসে পৌষ্য কোটাসহ নানান অযৌক্তিক কোটা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ৩২ হাজারতম অবস্থানে থাকা সত্তে¡ও পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়ে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ¯œাতক প্রথম বর্ষে মাত্র ৪০ নম্বর অর্জন করে তিনি প্রথমে বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে জীববিজ্ঞান অনুষদে স্থানান্তরিত হন। অথচ চলতি বছর ওই অনুষদে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩৫তম মেধাক্রম পর্যন্ত ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি শাবিপ্রবিতে পৌষ্য কোটাকে ‘সোসাইটিস মেরিট অ্যালোকেশন (এসএমএ)’ নাম দিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে। এছাড়াও ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর পেয়েও যেখানে হাজারও শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, সেখানে বিভিন্ন কোটায় ৪১-৪৬ নম্বর পেয়েও প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। 

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মকর্তার সন্তান স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক ভালো পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাদের হাতে থাকে পর্যাপ্ত পড়াশোনার উপকরণ, কোচিং বা গাইডলাইনের সুযোগ, এবং পারিবারিক সহায়তা। অন্যদিকে, সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই খেয়ে-না খেয়ে পড়াশোনা করে। এই দুই পরিবেশের মধ্যে বৈষম্য এতটাই স্পষ্ট যে, যদি একই পরীক্ষায় তারা সমান নম্বরও পায়, তবে আসলে প্রান্তিক পরিবারের সন্তানই বেশি যোগ্যতা ও দৃঢ়তা প্রমাণ করছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন একটি নামিদামি স্কুলে পড়া, তিন বেলা দুধ-কলা খাওয়া শিশুকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনে সে অগ্রাধিকার পাবে কেবল তার বাবা-মা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বলে? আর যে বাবা রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে দিনের পর দিন গ্রীস্মের দুপুরে ঘাম জড়িয়ে দু-মুঠো ভাত সন্তানের মুখে তুলে দেন- সেই সন্তান যখন ভালো মার্কস পেয়েও চান্স হয় না তখন সেই বাবার সাথে ঘটে যাওয়া বৈষম্যের হিসাব মিলাবে কে? 

কোটা প্রথার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সুযোগ দেওয়া। অর্থাৎ, যাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার ঝুঁকি বেশি, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু শিক্ষক বা কর্মকর্তার সন্তানরা সেই শ্রেণিতে পড়েন না। তারা কোনোভাবেই প্রান্তিক নন; বরং তারা রাষ্ট্রীয় সুবিধার দিক থেকে অনেকাংশেই এগিয়ে। ফলে তাদের জন্য আলাদা কোটা রাখাটা কোটা নীতির মৌলিক দর্শনের সাথেই সাংঘর্ষিক।

যতগুলো আসন বর্তমানে পৌষ্য কোটার নামে বরাদ্দ রাখা আছে, সেগুলো মূল আসনের সাথে একীভ‚ত করা উচিত। এর ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হবে আরও উন্মুক্ত ও সমান। শিক্ষার্থীরা জানবে, সবাইকে একই মানদÐে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, কারও জন্য আলাদা সুবিধা নেই। এতে শিক্ষাঙ্গণে যেমন ন্যায়বোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি মেধাবীরা প্রকৃত জায়গা করে নিতে পারবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে। যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতেই বৈষম্যের বীজ বপন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনোদিনও ন্যায্যতার শিক্ষা পাবে না। আজ যদি একজন রিকশাচালকের মেধাবী সন্তান কেবল পৌষ্য কোটার কারণে সুযোগ হারায়, তবে তার মধ্যে বঞ্চনার বোধ জন্মাবে, যা সমাজে ক্ষোভ ও বিভাজন বাড়াবে। অন্যদিকে, সুযোগ পাওয়া সন্তানটি হয়ত সেই যোগ্যতার যোগান দিতে পারবে না, ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার মানও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

আজ যে কোটা পুনর্বহাল করা হচ্ছে, তা মূলত শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে যারা রক্ত দিলেন, তাদের পরিবারগুলো আজও শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তারা ভেবেছিলেন, অন্তত তাদের সন্তানের প্রাণ বৃথা যাবে না, দেশ বদলাবে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সেই প্রত্যাশা ভঙ্গ করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন জাগে তাহলে শিক্ষার্থীদের সেই আত্মত্যাগ কি তবে অবমূল্যায়িত?

বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, ন্যায় এবং আস্থার পুনর্গঠন। যদি মেধা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করে আবারও বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। বরং রাষ্ট্র আবারও বৈষম্যের দুষ্টচক্রে আটকে যাবে। যদি গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তাহলে এই জেনারেশন অজান্তেই বলে উঠবে আগেই ভালো ছিলাম।

অতএব এখনই সময় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত শিক্ষার্থীদের রক্তের মূল্য দেওয়া। শিক্ষার্থীরা যে স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছে, সেই স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায্য, বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার। রাষ্ট্র যদি সেই স্বপ্নকে সম্মান না করে, তবে কেবল শিক্ষাঙ্গণ নয়, পুরো জাতিই আবারও আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হবে। তাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি শিক্ষার্থীদের আÍত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং নিয়োগে মেধাভিত্তিক সমতা নিশ্চিত করা। এটাই হবে সত্যিকার অর্থে তাদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
 


লেখক: মো. মোফাজ্জল হক, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।