প্রকাশিত: ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২০:২৫ (বৃহস্পতিবার)
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ: কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কি সম্ভব?

একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বিচার বিভাগই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা করে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে? বিচার বিভাগ কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত? সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাঠামোগতভাবে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে।


প্রথমেই আসি সরকারের শীর্ষ নির্বাহী ক্ষমতার উৎসে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) অনুযায়ী, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হলে রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হবেন সেই ব্যক্তি যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম। কোনো দল সংসদে অধিক আসন পেলে সাধারণত তাদের দলীয় প্রধানই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে সরকার গঠনের মূল শর্তই হলো—সংসদে কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে আসা যাক। অনুচ্ছেদ ৪৮(১) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। অর্থাৎ সংসদে যাদের প্রভাব ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে—তাদেরই পছন্দের ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচিত হন। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি স্বাভাবিকভাবেই সরকার দলের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বা অন্তত তাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫ (১) অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নিয়োগ দেন এবং তার সঙ্গে পরামর্শ করে সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারকদের নিয়োগের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা কতটা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারেন? অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) স্পষ্টতই বলে—রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। যদিও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে হয় না—এটি সত্য—তবে বাস্তবতা হলো, যখন রাষ্ট্রপতি সরকার দলের নির্বাচিত ব্যক্তি, তখন তিনি নিজ বিবেচনা প্রয়োগে কতটা স্বাধীন থাকেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিচারপতি নিয়োগে সরকার দলের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
 

অনুচ্ছেদ ৯৮ আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এখানে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন এবং তাঁদের কাজ সন্তোষজনক হলে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। কিন্তু যারা অস্থায়ী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা স্থায়ী নিয়োগ পাওয়ার আশায় সরকারকে খুশি রাখতে চাইবেন না—এমন নিশ্চয়তা কি দেওয়া যায়? রাষ্ট্রপতি যখন সরকার দলের মনোনীত ব্যক্তি এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন, তখন অস্থায়ী বিচারপতিরা রাজনৈতিক চাপমুক্ত থাকবেন—এ দাবি করা কঠিন।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুচ্ছেদ ৯৯(১)। এখানে বলা হয়েছে—অনুচ্ছেদ ৯৫(১) অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো বিচারক অবসরে যাওয়া বা অপসারিত হওয়ার পর প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ পেতে পারবেন না। অর্থাৎ অলাভজনক পদে তাঁদের নিয়োগে কোনো বাধা নেই। আবার অনুচ্ছেদ ৬৬(৩) উল্লেখ করে যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীর পদ লাভজনক পদ নয়। প্রশ্ন হলো—এই মর্যাদাপূর্ণ অলাভজনক পদগুলোর প্রত্যাশায় বিচারপতিরা দায়িত্ব পালনকালে কি রাজনৈতিক দলকে খুশি রাখতে চান না? অতীতের অভিজ্ঞতা বলে—অবসরের পর বেশ কয়েকজন বিচারপতি রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অলাভজনক পদে নিয়োগ পেয়েছেন, যা স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সৃষ্টি করে।
 

উপসংহারে বলা যায়—বিচার বিভাগ জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে মানুষ নিরপেক্ষতা, সুবিচার ও আস্থার সন্ধান করে। রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অপরিহার্য। আর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন—সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সব পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এখনই সময় বিচার বিভাগকে সত্যিকারের স্বাধীন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের।
 

লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।