ছবি : সিলেটভিউ।
সিলেটে যক্ষ্মা (টিবি) এখনো এক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের মধ্যে টিবির সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত চা বাগানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী। যেখানে অপুষ্টি, ঘনবসতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবায় সীমাবদ্ধতার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিলেট বিভাগীয় অফিসের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে শিশু টিবি রোগীর হার প্রতি বছরই বেড়ে চলছে। ২০২১ সালে শিশু আক্রান্তের হার ছিল ৩.৯৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৫.১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৬৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে সিলেট বিভাগে ২২,০২২ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। যা ২০২২ সালের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ২০২৩ সালের (২২,৮৫২ জন) চেয়ে কম। এই অঞ্চলে যক্ষ্মা আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৯% শিশু এবং চা বাগানের শ্রমিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, থুতুর সঙ্গে রক্ত ওঠা, বুকে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর এবং রাতের ঘাম-এগুলো যক্ষ্মা (টিবি) রোগের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক লক্ষণ। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চা-বাগান ও আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এসব লক্ষণ প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায় এবং সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, দুর্বল পুষ্টি, স্যাঁতসেঁতে ও ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়ি, টিবি–পজিটিভ রোগীর নিয়মিত সংস্পর্শে থাকা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি-এসবই যক্ষ্মা বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। নিম্নমানের পরিবেশে বসবাস ও অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে এক ঘরে অনেকের একত্রে থাকা এবং বাতাস চলাচলের অনুপস্থিতি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিবি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন দ্রুত রোগ শনাক্ত, নিয়মিত চিকিৎসা, পুষ্টিসহায়তা এবং ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি। এসব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যক্ষ্মা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, ‘চা বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকদের জীবনমান এখনো ন্যূনতম স্বাস্থ্যমানের বাইরে রয়ে গেছে। অতিরিক্ত ভিড়, স্যাঁতসেঁতে ও অস্বাস্থ্যকর ঘরবাড়ি, অপুষ্টি, নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার-এসবই টিবি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। অনেক পরিবারে পাঁচ থেকে আটজন একই ঘরে থাকতে বাধ্য হয়; এমন পরিস্থিতিতে একজন আক্রান্ত হলেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গবাদিপশুর সঙ্গে একই ঘরে বসবাসের মতো বাস্তবতাও টিবি বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখে। তাই চা বাগানগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা এবং পুষ্টিসহায়তা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।’
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, ‘চা বাগানের বহু বাসিন্দাই দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিতে ভুগছেন। অপুষ্টির কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। আবার ঘনবসতির কারণে সবাই একসঙ্গে থাকেন এবং অনেক সময় অজান্তে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে চলে আসেন। ফলে হাঁচি–কাশির মাধ্যমেই যক্ষ্মা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় চা বাগানগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাড়ি বাড়ি সচেতনতা বৃদ্ধি, সন্দেহভাজন রোগীর থুতু সংগ্রহ ও পরীক্ষা-সব কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.