আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শুরু হয়েছে প্রায় একসপ্তাহ ধরে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে- এমন দলগুলোর মধ্যে প্রধান দুটি দল হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াত। এই মুহুর্তে বাংলাদেশে বিএনপি সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। স্বাভাবিকভাবেই এ দলের মনোয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যাও বেশী। আর তাই দলটিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ে শঙ্কা থাকার কথা দলীয় উচ্চ পর্যায়ে। হচ্ছেও তাই। ইতিমধ্যেই সিলেট বিএনপিতে বিদ্রোহের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, যদিও প্রকাশ্যে কেউ-ই এখনো বিদ্রোহ ঘোষণা করেন নি।
সিলেট জেলার সিলেট-১ ও সিলেট ২ এদুটি আসন ছাড়া অন্য ৪টি আসনেই বিদ্রোহের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে অনেক দিন ধরে। বিশেষ করে দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আসনে মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই।
সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসন। সংসদ নির্বাচনের বেশ কয়েকটি টার্মে এই আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। জোটের শরিকদের জন্য আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। সে কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শক্ত একটা ধারণা ছিল, এবার এ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী দিবে। আর তাই মাঠে কাজ করছিলেন বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান সিলেট জেলা বিএনপির প্রথম সহ সভাপতি মামুনুর রশীদ যিনি চাকসু মামুন নামেই বেশী পরিচিত।
তবে দুই দফায় ১৭২টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হলেও এ আসনে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। এতে বিএনপিতে হতাশা নেমে আসে। সবার শক্ত ধারণা জন্মে যে, এবারও আসনটি জোটের শরিক বা আসন ভাগাভাগির রাজনীতিতে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন সিলেট-৫ আসনের জাতীয়বাদী ঘরনার নেতাকর্মীরা।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) এ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন মামুনুর রশীদ। তিনি সিলেটভিউর সাথে আলাপকালে বারবার বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন কি না, এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে বলেছেন, দলের উচ্চ পর্যায় থেকে তিন সাড়ে তিন মাস আগে তাকে প্রার্থী হতে বলা হয়েছে, তাই তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
কানাইঘাট-জকিগঞ্জের একাধিক বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে আলাপকালেও জানা গেছে, এবার তারাও দল থেকে প্রার্থী চান। আসন ভাগাভাগির বলি হতে আর রাজি নয় তারা। সেই হিসাবে মামুন যে প্রার্থীতা নিয়ে নেতাকর্মীদের চাপে আছেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। তিনি স্বীকার না করলেও তার মনোনয়পত্র সংগ্রহ বিদ্রোহের পথে পথচলা শুরু বলে মনে করছেন এ আসনের সচেতন মহল।
একইভাবে সিলেট-৪ ( কোম্পানীগঞ্জ-জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট) আসনেও বিদ্রোহের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এ আসনে সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্ঠা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকে সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়ও। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
বিষয়টি যেমন মেনে নিতে পারছেন না হাকিম চৌধুরী, তেমনি মানতে পারছেন না তার অনুসারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, তারা হাকিম চৌধুরীকেই দলীয় প্রার্থী হিসাবে চান। তাই দলের সিদ্ধান্ত রিভিউর জোর আবেদন জানিয়েছেন তারা। কিন্তু একান্ত যদি তা বিবেচনা করা না হয়, তাহলেও তারা চাইবেন হাকিম চৌধুরী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন।
হাকিম চৌধুরীর সঙ্গে দল মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী দফায় দফায় বৈঠক করলেও তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। এখনো তিনি রিভিউর পক্ষে অনঢ়। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন কি না, পরিস্কার তা উল্লেখ না করলেও তিনি নির্বাচনী এলাকায় ছুটতে ছুটতে সাধারণ মানুষের মতামত চাইছেন। মানে, এ আসনেও বিদ্রোহের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
সিলেট-৩ ( দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনেও বিদ্রোহের শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সচেতন মহল। তাদের মতে, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম এ আসনে দীর্ঘদিন থেকে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দল বেছে নিয়েছে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এমএ মালিক কে। তাছাড়া সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও এ আসনে শুধু মনোনয়ন প্রত্যাশী-ই ছিলেন না, বরং তিনি রাজনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এ অবস্থায় যে কেউ বিদ্রোহ করতে পারেন বলে আশঙ্কা অনেকের, যদিও তারা এখনো তেমন কোনো ঘোষণা দেন নি।
এদিকে সিলেট-৬ গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার আসনে বিদ্রোহের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এ আসনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্ঠা ফয়সল আহমদ চৌধুরী। এর অনেক আগে থেকেই তিনি আসনটিতে কাজ করছিলেন। মোটামুটি দলের বাইরেও এ আসনে তার একটা পরিচিতি এবং এক শ্রেণীর সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তবু এবার এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। বিষয়টি ফয়সল চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকরা মানতে পারছেন না এখনো। তারা রিভিউর আবেদন করেছেন। এখনো তারা সেই আবেদনে অনঢ়। তাদের প্রত্যাশা, দল বিষয়টি পূণঃবিবেচনা করবে।
তবে বিবেচনা না করা হলে তিনি কি করবেন? বিষয়টি এখনো পরিস্কার না। আছে কর্মী-সমর্থকদের চাপ। সব মিলিয়ে এ আসনেও বিদ্রোহের শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না ফয়সল চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকরা।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইকে/পিটি
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.