ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর সিলেটের তরুণরা। সেই স্বপ্ন পূরণে তারা দ্বারস্থ হচ্ছে মানবপাচারকারী মাফিয়া চক্রের। শেষ পর্যন্ত কারো স্বপ্ন ডুবছে ভূমধ্যসাগরে, আবার কেউ দেশে থাকতেই ঘটছে স্বপ্নের অপমৃত্যু। টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে এজেন্সির প্রতারক মালিকরা। আবার মাফিয়াদের নির্যাতনের বিভিষিকাময় দুঃস্বপ্ন নিয়ে যারা ফিরে আসতে পেরেছেন, তাদের জীবন ঘিরে দেখা দিয়েছে হতাশা।
গত এক বছরে সিলেটে এমন ৪১টি প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়েছে সরকারি দপ্তরে। জনশক্তি অফিসের কর্মকর্তা ও বৈধ ট্রাভেলস ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশ যেতে কারও সাথে চুক্তির আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা দেখা প্রয়োজন। আর অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন জনসচেতনতার।
সিলেটের তরুণদের মধ্যে বিদেশমুখীতার প্রবণতা সবসময়ই বেশি। তবে গেল কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে ওয়ার্কপারমিট ভিসায় কঠোরতার কারণে অনেকেই দালালদের মাধ্যমে অবৈধপথে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। এই পন্থায় কেউ কেউ সফল হলেও বেশিরভাগের জীবনেই নেমে এসেছে অন্ধকার।
দালালরা লিবিয়ায় নিয়ে ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর তরুণদের বিক্রি করে দিচ্ছে মাফিয়াদের কাছে। শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব খুইয়ে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে দেশে ফিরছেন তারা। আবার সিলেটের কোন কোন এজেন্সি ইউরোপে পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জকিগঞ্জ উপজেলার এক তরুণ জানান, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়। নির্যাতন থেকে বাঁচতে মাফিয়াদের চাপে বাড়ির ভিটে বিক্রি ও ঋণ করে অনেক টাকা দেন তিনি। এরপর ইতালির উদ্দেশ্যে গেম (নৌকায় করে পাঠানো) দেওয়া হয়। নৌকাটি আধাঘন্টা চলার পর ওই চক্রই পুলিশ দিয়ে তাদেরকে আটক করায়। এরপর ৫ দিন জেলে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।
পরে দালালচক্র তাদেরকে জেল থেকে বের করে আরেকটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে জানালা ভেঙে বন্দিদশা থেকে ওই যুবকসহ ৫ জন পালাতে সক্ষম হন। ওই তরুণ জানান, বিভিন্ন ধাপে দালালরা তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
বিয়ানীবাজারের আরেক যুবক জানান, ১০ দিনের মধ্যে বৈধভাবে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে তাকে দুবাই নেওয়া হয়। সেখানে ২২ দিন রাখার পর তুর্কিতে ট্রানজিট দিয়ে নেওয়া হয় আলবেনিয়ায়। সেখান থেকে নেওয়া হয় বসনিয়ায়। এরপর ক্রোয়েশিয়া হয়ে ইতালিতে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। ১৫ বারের চেষ্টায় ওই যুবক ইতালিতে পৌঁছাতে পারলেও সাড়ে ৯ মাসের নির্যাতনে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি দেশে ফিরেন। ওই যুবক জানান, দালাল ও মাফিয়া চক্রের খপ্পরে পড়ে তিনি এখন পথের ফকির।
আটাব সিলেটের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল জানান, মানবপাচারের উদ্দেশ্যে সিলেটসহ সারাদেশে অনেক অবৈধ এজেন্সি গড়ে ওঠেছে। এদেরকে দমন করা না গেলে এরা মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে বিপথগামী করবেই। তাই এসব মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
সিলেট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুস সাকিব বলেন, অবৈধভাবে যারা বিদেশের পথে পা বাড়ায় তারা শুরুতে বাস্তবতা বুঝতে পারে না। যারা এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সফল হয়েছে তারা কেবলই তাদেরকে দেখে। কিন্তু ব্যর্থদের কান্না তারা শুনতে পায় না বলেই তারা এ পথে পাড়ি বাড়ায়। সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে কেউ বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্তত প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
এক্ষেত্রে কেউ প্রতারিত হলে প্রতিকার পাওয়ারও সুযোগ থাকে। গত এক বছরে বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণার ৪১টি অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানান জনশক্তি অফিসের ওই কর্মকর্তা।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.