মর্যাদার আসনসহ ছয়টি আসন নিয়ে গঠিত সিলেট। সিটি করপোরেশন, ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভা রয়েছে এই জেলায়। বিগত সরকারের আমলে সিলেটে দৃশ্যমান তেমন কোন উন্নয়ন পরিলিক্ষত হয়নি বলে অভিযোগ ভোটারদের। আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দম ফেলার ফুরসত নেই প্রার্থীদের। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জনসংযোগ ও উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।
প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরাও সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্নভাবে প্রচারণায় করে যাচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটের মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে। ভোটের মাঠে কে কাকে পরাস্থ করে ভোট ভাগিয়ে নিতে পারছেন সেই অঙ্ক কষছেন প্রার্থীরা। তবে এবার সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে দুটি আসনে স্বতন্ত্র আর বিকল্প প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এসব প্রার্থী একদিকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন, অন্যদিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে দল। যদিও তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়।
এদিকে, সীমান্ত লাগোয়া আসনসমূহ সিলেট-১ আসনের জনপদের জীবনে-যাপনে প্রতিনিয়ত লড়তে হয় জলাবদ্ধতা, দখলবাজি, মাদক আর কিশোর গ্যাংয়ের হুমকি মাথায় নিয়ে। এই আসনগুলোতে যেমন রয়েছে নানাবিধ সমস্যা, তেমনি এর মাঝেই লুকিয়ে আছে নানাবিধ সম্ভাবনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীরা দিচ্ছেন পরিবর্তনের নানা প্রতিশ্রুতি। ‘পাহাড়সম’ সমস্যা, দূর করার আশ্বাস দিয়ে প্রার্থীরা দিচ্ছেন ‘রূপান্তরের’ প্রতিশ্রুতি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ৬টি আসনে জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা শিক্ষায় যেমনটি এগিয়ে, তেমনিভাবে তাদের সকলেরই পেশা ব্যবসা। অপরদিকে তাদের সকলের স্ত্রী-ই গৃহিণী। অন্যদিকে শিক্ষার দিক থেকে বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী পিছিয়ে থাকলেও তাদের স্ত্রীরা সম্পদশালী।
জানা গেছে, সিলেট-১ আসন থেকে ভোটে লড়ছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের কারণে একাই তিনি নির্বাচনি প্রচারণা করেন ভোটের সময়। এবার তার সাথে নির্বাচনি মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলার জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান। কৌশলী হাবিবুর রহমান ভোটারদের ভোট টানতে নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। এবারই প্রথম তিনি সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন।
সিলেট-২ আসন থেকে ভোটে লড়ছেন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা। অন্যপ্রার্থীদের চেয়ে ভোটের মাঠে স্বামীর উত্তরসুরি হিসেবে তিনি খুবই শক্তিশালী। তার সাথে ভোটে লড়ছেন সিলেট জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আবদুল হান্নান। এ আসনে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীসহ অন্যরা।
সিলেট-৩ আসনে লড়ছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল মালিক। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কারণে প্রবাসে থাকলেও দলের নেতাকর্মীসহ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে তার গ্রহণ যোগ্যতা। তবে এ আসনে লড়ছেন জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ। সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
সিলেট-৪ আসনে লড়ছেন সিসিকের সাবেক মেয়র ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। রাজনৈতিক দক্ষতা আর ভোটের কৌশলে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যে আরিফ দলের নেতাকর্মীসহ ভোটারদের মনজয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তার সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন জামায়াতের আরেক শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। জয়নালের রয়েছে বিশাল ভোট ব্যাংক ও দলের নিবেদিত নেতাকর্মী। তবে এই আসনে কওমী মাদরাসাসহ মুফতি, মাওলানাদের বিশাল একটি অংশ কাজ করছে আরিফের পক্ষে।
সিলেট-৫ আসনে বিএনপির দলীয় কোন প্রার্থী না থাকলেও বিএনপি জোটের প্রার্থী হলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক। তার সাথে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন ও জামায়াতের প্রার্থী হাফিজ মো. আনওয়ার হোসাইন খান। জমিয়ত আর বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত মামুনকে নিয়ে নতুনভাবে অঙ্ক কষছে জামায়াত। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফসল ঘরে তুলতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা।
সিলেট-৬ আসনে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও বিকল্প প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরী। আর তাদের সাথে ভোটের মাঠে অনেক বেশী সক্রিয় রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। বিএনপির প্রার্থীতার দ্বন্ধের অবসান না হলে এই আসনটিতে ভাগ বসাতে চায় জামায়াত। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে শেষ মূহুর্তে এমরান অথবা ফয়সল বসার সিদ্ধান্ত আসবে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ফয়সল আহমদ চৌধুরী লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন।
সিলেট-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, অনেক দিন থেকে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। কারণ দিনের ভোট রাতে হয়ে যেত। এবার কিন্তু ব্যতিক্রম ভোট উৎসব হবে। মানুষ ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। আমি বিশ্বাস করি, তারা এবার তাদের ভোট জাতীয়তাবাদী চেতনার দল বিএনপির প্রতীক ধানের শীষেই প্রদান করবে।
সিলেট-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সিলেট-৪ আসনে বিএনপি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী। ভোটাররা উদগ্রীব হয়ে আছে ধানের শীষের প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য। যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই সাড়া পাচ্ছি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন এক উন্নয়ন অভিযাত্রা শুরু করব।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে বিজয়ী করতে হবে। সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিটি/এসডি-২০
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.