প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২১:২৮ (বৃহস্পতিবার)
ভর্তির নামে অর্থ আদায় বন্ধ হোক, স্বস্তি পাক অভিভাবকরা

বাংলাদেশে গত দুই দশকে মোট প্রজনন হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০০৮ সালে যেখানে প্রতি নারীর গড়ে সন্তান সংখ্যা ছিল প্রায় ২.৫৮, সেখানে ২০১০ সালে তা কমে প্রায় ২.৩৮ হয়। ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী শহরে গড়ে প্রায় ২.০ এবং গ্রামে প্রায় ২.৪ সন্তান দেখা যায়, জাতীয়ভাবে প্রায় ২.৩। ২০২০ সালে এটি আরও কমে প্রায় ২টির কাছাকাছি নেমে আসে এবং সাম্প্রতিক তথ্যে শহরে গড়ে সন্তান সংখ্যা ২টির নিচে, গ্রামে ২ থেকে ৩টির মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে একটি পরিবারের সাধারণত ২ থেকে ৩টি সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব বহন করতে হয়, ফলে শিক্ষাব্যয় এখন পরিবারের বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধরা যাক গ্রামাঞ্চলে ২০০৬ সালে বিবাহিত এক দম্পতির তিন সন্তান যথাক্রমে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৫ সালে জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে তারা উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরে পড়ছে। যদি ভালো মানের একটি বেসরকারি স্কুল বা কলেজে গড়ে ভর্তি ফি ১০ হাজার টাকা ধরা হয়, তবে বছরে শুধু ভর্তি বাবদ ওই অভিভাবককে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। শহরের ক্ষেত্রে যদি দুই সন্তানের জন্য গড়ে ভর্তি ফি ২৫ হাজার টাকা ধরা হয়, তবে বছরে ভর্তি বাবদই প্রায় ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন। বাস্তবে খুব কম সংখ্যক অভিভাবক এই ব্যয় সহজে বহন করতে পারেন। অনেকেই কষ্ট করে দেন, কেউ বাধ্য হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠান, আবার অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটে বিশেষ করে গ্রামে মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—একজন শিক্ষার্থীকে কেন প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি হতে হবে? একই প্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া কি নতুন ভর্তি হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত? একজন শিক্ষার্থী একই প্রতিষ্ঠানে কতবার ভর্তি নেবে? ভর্তির নামে অপ্রয়োজনীয় অর্থ আদায় কি শিক্ষাকে বাণিজ্যিক করে তুলছে না? এই নীতি কি শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াচ্ছে না? এসব প্রশ্ন বহু অভিভাবকের মনে থাকলেও অনেকে আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক কারণে প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু এই নীরবতা শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমাগত বাণিজ্যিক রূপ দিচ্ছে এবং অভিভাবকদের উপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক অনিয়ম রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নীতিমালা, ২০২৬” অনুযায়ী এখন থেকে একই প্রতিষ্ঠানে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনরায় ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি তা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে নীতিমালা জারি করাই শেষ কথা নয়—বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অভিভাবকদের বড় আর্থিক চাপ কমবে, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়বে, মেয়েদের ঝরে পড়া কমবে এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি বছর নতুন ভর্তি ফি নেওয়ার প্রথা বন্ধ করে নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।
 

লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।