প্রকাশিত: ২০ মার্চ, ২০২৬ ১৯:২০ (বৃহস্পতিবার)
আবার সেই ভর্তিযুদ্ধ!

সরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চতর শ্রেণিগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষা অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা, বিতর্ক ও উদ্বেগ। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে—“ভর্তিতে লটারি বাতিল করলেই কি শিক্ষার মান বাড়বে?”—এই প্রশ্নটিই আজ জনমনে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।


আসলে প্রশ্নটি শুধু পদ্ধতির নয়, দর্শনের। আমরা কি শিক্ষার শুরুতেই শিশুদের প্রতিযোগিতার কঠিন মাঠে নামাতে চাই, নাকি তাদের জন্য একটি সমতাভিত্তিক ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই?


ভর্তি পরীক্ষা মানেই প্রতিযোগিতা, আর সেই প্রতিযোগিতা যখন কোমলমতি শিশুদের ঘিরে ধরে, তখন তা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য চাপ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে—এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট নির্ভরতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো অসংখ্য সমস্যা। ফলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের জন্য ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে যায়। এই বাস্তবতা থেকেই একসময় লটারি পদ্ধতির উদ্ভব, যা অন্তত সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস ছিল—এবং তা শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থনও পেয়েছিল।

শিশু বয়সে মেধার পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন—এটি একটি স্বীকৃত সত্য। অথচ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে খুব অল্প বয়সেই শিশুদের ‘সফল’ ও ‘ব্যর্থ’ হিসেবে ভাগ করা হয়। একটি শিশুর ব্যর্থতা কেবল একটি ফলাফল নয়, বরং তার আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানার ঝুঁকি বহন করে। প্রশ্ন জাগে—একটি শিশুর কি ভালো বিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার নেই? রাষ্ট্র কি তার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে না?


প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই কতটা যৌক্তিক—এটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা Nelson Mandela-এর ভাষায়, “একটি সমাজের আত্মা বোঝা যায় তারা তাদের শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে।” সেই বিবেচনায়, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহাল শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং কোচিং নির্ভরতা নতুন করে উসকে দেবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।


তবে এটিও সত্য, লটারি পদ্ধতিও সর্বাংশে নিখুঁত নয়। এতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাই একতরফা সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রমাণভিত্তিক নীতি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ—নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও গবেষকদের অংশগ্রহণে একটি বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।


সবশেষে, মূল সমস্যাটি ভর্তিপদ্ধতিতে নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষার অসম বণ্টনে। যদি দেশের প্রতিটি এলাকায় সমমানের উন্নত বিদ্যালয় গড়ে তোলা যায়, তাহলে ভালো স্কুলে ভর্তির এই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা অনেকটাই কমে আসবে। তখন আর “ভর্তিযুদ্ধ” শব্দটি আমাদের বাস্তবতার অংশ থাকবে না—বরং শিক্ষা হবে সবার জন্য সমান সুযোগের একটি অধিকার, কোনো সংগ্রাম।
 

লেখক: সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি) আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।