প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:০০ (বৃহস্পতিবার)
কিছু হিসাব কখনো মেলে না: বুলেট বৈরাগীর মৃ ত্যু এবং রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা!

পৃথিবীর অনেক হিসাবই কখনো মেলে না। কিছু মৃত্যু শুধু একজন মানুষের জীবন শেষ করে না; সঙ্গে নিয়ে যায় বহু মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ। বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু তেমনই এক নির্মম প্রতীক, যা আজ শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।


একজন তরুণ—যিনি জীবনের প্রতিটি ধাপে সংগ্রাম করে এগিয়ে গেছেন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নন-ক্যাডারে একটি সম্মানজনক চাকরি পেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ। সংসার ছিল, ভালোবাসার মানুষ ছিল, একটি ফুটফুটে সন্তান ছিল। পরিবারজুড়ে ছিল স্বপ্ন, আশা আর বেঁচে থাকার স্বাভাবিক আনন্দ। একজন মধ্যবিত্ত তরুণের জীবনে যা থাকে—সংগ্রাম, দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং সামান্য কিছু সুখের স্বপ্ন—সবই ছিল তাঁর জীবনে।
 

কিন্তু এক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। ছিনতাইকারীরা তাঁর কাছ থেকে কী নিয়েছে? একটি মোবাইল ফোন, কিছু টাকা—এর বেশি কিছু নয়। অথচ বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে একটি প্রাণ, একটি শিশুর বাবাকে, একজন নারীর জীবনসঙ্গীকে এবং একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্নকে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটি ছিল তাঁর নিথর দেহের পাশে স্ত্রীর নির্বাক বসে থাকা। স্বামীর লাশের বুকে কান পেতে হয়তো শেষবারের মতো শুনতে চেয়েছিলেন হৃদস্পন্দনের শব্দ। কিন্তু সেখানে আর কোনো স্পন্দন নেই। নেই কোনো উষ্ণতা, নেই জীবনের কোনো সাড়া। আছে শুধু এক হিমশীতল নীরবতা। কিছু শোক সত্যিই এমন হয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মানুষ তখন কাঁদতেও ভুলে যায়, বিলাপ করতেও পারে না। শুধু স্তব্ধ হয়ে যায়।


এই দৃশ্যটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কারণ আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্রমশ এমন এক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে, যেখানে ঘর থেকে বের হয়ে কেউ নিশ্চিত থাকতে পারে না যে সে আবার জীবিত ফিরে আসবে কি না।

খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ—এসব যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। সংবাদপত্রে এমন খবর পড়ে মানুষ কিছু সময় শোক প্রকাশ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট হয়, তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু যে পরিবারটি সব হারায়, তাদের জীবনে আর কিছুই স্বাভাবিক থাকে না।

বুলেট বৈরাগীর ছোট্ট সন্তান হয়তো এখনো বুঝতে পারেনি তার বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না। হয়তো প্রতিদিন বাবার জন্য অপেক্ষা করবে। হয়তো কোনোদিন স্কুলের অনুষ্ঠানে অন্য শিশুদের বাবাকে দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করবে। একজন সন্তানের জীবনে বাবার অনুপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও অস্তিত্বগত এক গভীর ক্ষত।
 

অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী—যিনি হয়তো জীবনের সব স্বপ্ন এই মানুষটিকে ঘিরেই দেখেছিলেন—এখন তাঁকে বয়ে বেড়াতে হবে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা এবং অসহনীয় স্মৃতির ভার। একটি হত্যাকাণ্ড কেবল একজন মানুষকে হত্যা করে না; এটি ধীরে ধীরে আরও অনেক মানুষকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়।
বাংলা সাহিত্য ও উপাখ্যানে প্রেমের অনেক গল্প আছে। মজনুর মৃত্যু হয়েছিল লাইলীর কবরে মাথা রেখে—সেটি ছিল কাব্যের বেদনা। কিন্তু বাস্তবের এই দৃশ্য কোনো কাব্য নয়; এটি এক নির্মম রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যখন একজন নাগরিক সড়কে নিরাপদ নয়, যখন একজন কর্মজীবী তরুণ স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারে না, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব কতটা পালন করতে পারছে?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে অমানবিক করে তোলে। অপরাধীরা যখন বুঝতে পারে যে তারা সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে, তখন অপরাধ আরও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন আইনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে। ভয়, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
 

আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক দেশে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে? যেখানে একজন নিরীহ মানুষ নিজের জীবন নিয়ে নিরাপদ নয়?
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বড় বড় স্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে নয়; বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিতে। মানুষ যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সব অর্জন একসময় অর্থহীন হয়ে পড়ে।


বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু আমাদের সামনে সেই কঠিন সত্য আবারও তুলে ধরেছে। এই মৃত্যু শুধু শোকের নয়; এটি সতর্কবার্তাও। যদি অপরাধ দমন, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এমন অসংখ্য পরিবার প্রতিদিন ভেঙে পড়বে।

পৃথিবীর কিছু হিসাব সত্যিই কখনো মেলে না।
একজন বিধবা নারীর জীবনের হিসাব,
একটি এতিম শিশুর ভবিষ্যতের হিসাব,
একটি পরিবারের শূন্যতার হিসাব—
কোনোদিনই আর পুরোপুরি মিলবে না।
তবু রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা একটাই—
আর যেন কোনো পরিবারকে এভাবে স্বপ্নের লাশ বুকে নিয়ে বসে থাকতে না হয়।

 

লেখক : মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।