প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬ ১৮:০৪ (মঙ্গলবার)
ধ*র্ষ*ণ আইন ও বিচার বিলম্ব, ন্যায়বিচারের বাস্তব সংকট

দণ্ডবিধি, ১৮৬০–এর ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৩৭৬ ধারায় এর শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্য একটি বিশেষ আইন কার্যকর রয়েছে—নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০। আইনগত নীতিমালা অনুযায়ী, বিশেষ আইন সর্বদা সাধারণ আইনের উপর প্রাধান্য পায়। তাই ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডবিধি নয়, বরং এই বিশেষ আইনের বিধানই প্রয়োগযোগ্য।এই আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণ, ধর্ষণের ফলে মৃত্যু, গণধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা এবং হেফাজতে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, পাশাপাশি ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার প্রতিকারমূলক দিককে শক্তিশালী করে।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন,২০০০ এর ২৬ ধারায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা সদরে অন্তত একটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। এসব ট্রাইব্যুনাল জেলা ও দায়রা জজ অথবা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বারা পরিচালিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলার বিশেষায়িত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।তত্ত্বগতভাবে আইনটি কঠোর, প্রতিরোধমূলক এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৪৮৩ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে এবং আরও অন্তত ৩১৮ জন নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; বরং এটি সমাজে বিদ্যমান নিরাপত্তাহীনতা, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রতিরোধ কাঠামোর সীমাবদ্ধতার এক নির্মম বাস্তব চিত্র।এই বাস্তবতাকে বুঝতে কিছু আলোচিত ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।আছিয়ার ঘটনায় দেখা যায়, অভিযুক্ত হিটু শেখকে গত বছরের ১৭ মে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। রায় ঘোষণার মাত্র চার দিনের মধ্যে মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্ট বিভাগে প্রেরণ করা হয়, যা প্রাথমিকভাবে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু রায় ঘোষণার পর এক বছর অতিক্রান্ত হলেও হাইকোর্ট বিভাগে সেই ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে জানা যায়। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় থেকে যায়, যা দ্রুত ন্যায়বিচারের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অন্যদিকে রসু খাঁর ঘটনা বিচার ব্যবস্থার চূড়ান্ত পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রিতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ। প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারীকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে চাঁদপুর আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগও সেই রায় বহাল রাখে। তবুও চূড়ান্ত রায় বহাল থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি এবং তিনি বর্তমানে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় আছেন। এই দীর্ঘ বিলম্ব বিচার ব্যবস্থার চূড়ান্ত বাস্তবায়নের কার্যকারিতা ও ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

আইনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আইনের ১৮ ধারায় তদন্ত কার্যক্রম ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে ২০(৩ক) ধারায় অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ আইনটি শুধুমাত্র শাস্তির কাঠামো নয়, বরং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও প্রদান করে।তবে বাস্তবে এই সময়সীমা সব ক্ষেত্রে প্রতিপালিত হয় না। তদন্ত ও বিচার উভয় পর্যায়ে বিলম্ব ঘটে, যা আইনের উদ্দেশ্যকে কার্যত দুর্বল করে দেয়।একইভাবে আপিল ও রায় কার্যকরের পর্যায়ে আরও একটি কাঠামোগত শূন্যতা লক্ষ্য করা যায়। আইনের ২৮ ধারায় আপিল করার জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও আপিল নিষ্পত্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আবার ২৯ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও সেই অনুমোদনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি। একইভাবে চূড়ান্ত রায় কার্যকরের ক্ষেত্রেও সময়সীমার অনুপস্থিতি দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ তৈরি করে।

এই বাস্তবতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—দ্রুত বিচার কি কেবল রায় ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি রায় কার্যকর হওয়াও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ? কারণ ন্যায়বিচারের পূর্ণতা তখনই অর্জিত হয়, যখন বিচার শুধু সম্পন্ন হয় না, বরং তা বাস্তবেও কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাগুলো একজন আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম।এই প্রস্তাবনাগুলো আমি মনে করি সরকারের উচিত বিবেচনা করা—

১. আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট, যুক্তিসংগত ও বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা,যাতে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা হ্রাস পায় এবং ভুক্তভোগী দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচার লাভ করতে পারেন।

২. মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন (confirmation) প্রদানের জন্য একটি নির্ধারিত সময়সীমা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে রায়ের চূড়ান্ততা নিশ্চিত হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব এড়ানো যায়।

৩. রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত ও নির্দিষ্ট সময় কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা,যাতে দণ্ড কার্যকরণে অনিশ্চয়তা দূর হয় এবং ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রয়োগ আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়।

পরিশেষে বলা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকাররা সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। তাই আইন শুধু কঠোর হলে যথেষ্ট নয়; তার বাস্তব প্রয়োগও হতে হবে দ্রুত, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক। ন্যায়বিচারের প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হয়, যখন তা কেবল বিধানে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

 

লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।