প্রকাশিত: ০৪ জুন, ২০২৬ ২০:১১ (শুক্রবার)
ঘুমের ঘাটতি আধুনিক জীবনের অবমূল্যায়িত স্বাস্থ্যঝুঁকি

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে কিছু নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি | এর মধ্যে অন্যতম হলো ঘুমের ঘাটতি।


একসময় পর্যাপ্ত ঘুমকে সুস্থ জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো | কিন্তু আজকের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে অনেকেই ঘুমকে গুরুত্বহীন মনে করেন | কেউ কাজের চাপে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে, আবার কেউ মানসিক চাপের কারণে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না | ফলস্বরূপ, ঘুমের অভাব এখন একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে |


ঘুম মানুষের শরীরের একটি মৌলিক জৈবিক চাহিদা | 


 আমরা যখন ঘুমাই, তখন শরীর ও মস্তিষ্ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠনমূলক কাজ সম্পন্ন করে দিনের ক্লান্তি দূর করা, কোষের ক্ষয়পূরণ, স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ঘুমের সময়ই সম্পন্ন হয় | তাই ঘুমকে অবহেলা করা মানে নিজের স্বাস্থ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া |

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন | শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি | কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিপুল সংখ্যক মানুষ নিয়মিতভাবে এই প্রয়োজনীয় ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন |  অনেকেই মনে করেন, কম ঘুমিয়েও শরীরকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব | কিন্তু গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের ঘাটতি শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শারীরিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে |
ঘুমের অভাবের প্রথম প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কের ওপর | পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে | একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে যেতে পারে, একজন কর্মজীবী ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করতে পারেন এবং একজন চালক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন | গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাবে মানুষের প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা কমে যায়, যা সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ |

ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে | যারা দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, খিটখিটে মেজাজ এবং মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বেশি দেখা যায় | অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের মানসিক অস্থিরতার পেছনে ঘুমের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ |

 পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক প্রশান্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে |


 শুধু মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যও ঘুমের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল | পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় | ঘুমের সময় শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবে কিছুটা কমে যায়, যা হৃদযন্ত্রকে বিশ্রাম দেয় | কিন্তু ঘুম কম হলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়   |

ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
|

 গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন কম ঘুমালে শরীরের ইনসুলিন কার্যকারিতা কমে যেতে পারে | ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় |  বর্তমানে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের পেছনে অনিয়মিত জীবনযাপন ও ঘুমের ঘাটতিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে |

স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির সঙ্গেও ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে | পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় | ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং মানুষ বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার খেতে আগ্রহী হয় | বিশেষ করে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে | এর ফলে ধীরে ধীরে ওজন বৃদ্ধি পায় এবং স্থূলতা দেখা দেয় |

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার ঘুমের অন্যতম শত্রু হয়ে উঠেছে | ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে চোখে নীল আলোর প্রভাব পড়ে, যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের উৎপাদন কমিয়ে দেয় | ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও খারাপ হয় | অনেকেই বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর অভ্যাস |

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও উদ্বেগজনক | বর্তমানে অনেক শিশু মোবাইল গেম, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। ফলে তারা পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে | এর প্রভাব তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা বিকাশ এবং শিক্ষাজীবনের ওপর পড়ছে | অভিভাবকদের উচিত শিশুদের ঘুমের বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হওয়া |

ঘুমের মান ভালো রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে | প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস | ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, টেলিভিশন ও অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত | শোবার ঘর শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক হওয়া প্রয়োজন | বিকেলের পর অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ না করাই ভালো |
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও ভালো ঘুমে সহায়তা করে |

 প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম ঘুমের মান উন্নত করতে পারে | 

তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম করা উচিত নয় | একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও জরুরি |
আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই মনে করেন, বেশি কাজ করার জন্য ঘুম কমিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ | কিন্তু বাস্তবে এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর | 

পর্যাপ্ত ঘুম  কোনো অলসতার লক্ষণ নয় বরং এটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জীবনের অন্যতম শর্ত |

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুমের গুরুত্ব নিয়ে আরও বেশি সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন | যেমন আমরা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক ব্যায়াম এবং ধূমপানবিরোধী প্রচারণা চালাই, তেমনি পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্ব সম্পর্কেও মানুষকে সচেতন করতে হবে | কারণ ঘুমের অভাব শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ |


ঘুম কোনো বিলাসিতা নয় এটি সুস্থ জীবনের অপরিহার্য উপাদান | শরীর ও মনের সুস্থতা, কর্মক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই | তাই আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের ঘুমকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিতে হবে | 


আজকের একটি ভালো ঘুম আগামী দিনের সুস্থ জীবনের বিনিয়োগ।

 


লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য)।