প্রকাশিত: ০৪ জুন, ২০২৬ ২১:১৫ (শুক্রবার)
সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক: যেন অনিয়ম ও লুটপাটের স্থায়ী চারণভূমি

​একটি টেকসই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেকোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সালুটিকর-গোয়াইন ঘাট ’ সড়কটির ক্ষেত্রে উন্নয়ন যেন এক অন্তহীন দুর্ভোগ আর দুর্নীতির গল্পে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে এই সড়কের ১০ কিলোমিটার অংশে আরসিসি (RCC) ঢালাইয়ের কাজ নিয়ে যা চলছে, তাকে কোনোভাবেই জনকল্যাণমূলক কাজ বলা চলে না; বরং এটি এখন অনিয়ম ও লুটপাটের কারখানায় রূপান্তরিত হয়েছে।
 

​আমরা জানি, এই সড়কের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি ও বড় ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হন। মানববন্ধন, তীব্র প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হয়। তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় পূর্বের ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল, জরিমানা এবং লাইসেন্স বাজেয়াপ্তকরণের মতো প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন। পরবর্তীতে বাজেট বৃদ্ধি করে অবশিষ্ট অংশের জন্য পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
 

​নতুন টেন্ডার এবং নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পর ভাবা হয়েছিল, এবার হয়তো সড়কটি তার কাঙ্ক্ষিত রূপ ফিরে পাবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডেও এখন ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম দিকে লোকদেখানো ভালো কাজ করলেও, বর্তমান কাজের চিত্র চরম হতাশাজনক।
 

​সরেজমিনে সড়কের বর্তমান চিত্র ও অনিয়মের খতিয়ান:
​নিম্নমানের গর্ত ভরাট: পুরো রাস্তাটি বর্তমানে খানাখন্দে ভরা। নিয়ম অনুযায়ী এসব গভীর গর্ত কনক্রিট দিয়ে ভরাট করে মজবুত করার পর ঢালাই দেওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে নামমাত্র ‘বিট বালু’ দিয়ে গর্তগুলো ভরাট করা হচ্ছে, যা চরম টেকসইহীন।

​প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অপব্যবহার: বালু ভরাট করার পর তা রোলার দিয়ে চেপে শক্ত করা হচ্ছে না। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঢালাইয়ের সময় কোনো ধরনের ‘ভাইব্রেটর মেশিন’ ব্যবহার করা হচ্ছে না, যা আরসিসি ঢালাইয়ের স্থায়িত্বের জন্য বাধ্যতামূলক।
 

​অনুপাতের কারচুপি: ঢালাইয়ের মিশ্রণটি (মিক্সিং) মূল কাজের স্থান থেকে দূরে বা আড়ালে করার কারণে পাথর, বালু ও সিমেন্টের সঠিক অনুপাত যাচাই করার কোনো সুযোগ থাকছে না। খালি চোখে দেখলেই বোঝা যায়, মিশ্রণে পাথরের তুলনায় বালুর পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি এবং সিমেন্টের পরিমাণ নামমাত্র।

​প্রকৃতির দোহাই ও তাড়াহুড়ো: রোদ, মেঘ কিংবা ঝড়-বৃষ্টি—যেকোনো বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে।

​এই চরম অব্যবস্থাপনার বাস্তব ফলাফল যা হওয়ার ঠিক তা-ই হচ্ছে—একদিকে রাস্তার ঢালাইয়ের কাজ এগিয়ে চলছে, অন্যদিকে উদ্বোধনের আগেই তা ভেঙে বা ধসে যাচ্ছে। এটি কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং জনগণের টেকসই সড়ক পাওয়ার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে এক ধরনের নিষ্ঠুর তামাশা।
 

​এভাবে চলতে থাকলে সরকারের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প সম্পূর্ণ ভেস্তে যাবে এবং গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়কের দুর্ভোগ কোনোদিনই শেষ হবে না। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—অনতিবিলম্বে এই চলমান কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হোক। টেকসই ও মানসম্মত সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করতে বর্তমান ঠিকাদারের কাজের ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনে আবারও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
 


লেখক: মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।