প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ২২:১৯ (শুক্রবার)
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ, সুস্থ জাতি গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ

বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে  | অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে | তবুও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান | এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর এবং টেকসই উপায় হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা |


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা | কারণ স্বাস্থ্যসেবার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ সহজে, দ্রুত এবং কম খরচে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে |  প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হলে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়ে যায় |

কেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ  ?
অনেক সময় আমরা স্বাস্থ্যসেবা বলতে বড় হাসপাতাল, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কথা ভাবি | কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব কমিউনিটি পর্যায়ে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে |
একজন শিশুর টিকা গ্রহণ, একজন গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ কিংবা অপুষ্টির ঝুঁকি নিরূপণ এসবই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ |

যখন এসব সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি এবং অকাল মৃত্যুর হার কমে আসে |  ফলে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র সবাই উপকৃত হয় |

স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ কেন ব্যয় নয়, বরং সঞ্চয় 

অনেকেই মনে করেন স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা মানে শুধু অর্থ খরচ করা | কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের উৎস |

একজন সুস্থ মানুষ কর্মক্ষম থাকে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে | অন্যদিকে অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা হারায়, যার প্রভাব পড়ে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে |

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ করলে পরবর্তীতে ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যায় | অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় এক টাকা বিনিয়োগ ভবিষ্যতে কয়েক গুণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারে |

মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভূমিকা
একটি দেশের স্বাস্থ্য সূচক মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হলো মাতৃমৃত্যুর হার | গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ |

বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে | তবে এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক নারী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত |
যদি কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মী , প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কারীদের   কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা যায়, তাহলে মাতৃস্বাস্থ্যের আরও উন্নতি সম্ভব |


শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বিনিয়োগ
একটি শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | এ সময়ের পুষ্টি, টিকাদান এবং স্বাস্থ্যসেবা তার ভবিষ্যৎ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নির্ধারণ করে |
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) শিশু মৃত্যুহার কমাতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে | হাম, ডিপথেরিয়া, পোলিওসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে |
তবে এখনও অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং শিশুর বিকাশজনিত সমস্যা উদ্বেগের বিষয় | প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিশুদের জন্য পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে |


অপুষ্টি মোকাবিলায় কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ
অপুষ্টি শুধুমাত্র খাদ্যের অভাব নয় এটি একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা | অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, শিক্ষা গ্রহণে সমস্যা হয় এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় |

অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতাও বর্তমানে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে |

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মাতৃদুগ্ধ পান, সম্পূরক খাদ্য এবং পুষ্টি শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অপুষ্টির বোঝা অনেকাংশে কমানো সম্ভব


অসংক্রামক রোগের বাড়তি ঝুঁকি
বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে |
এই রোগগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন হয় | কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব |
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, রক্তে শর্করা পরীক্ষা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং জীবনধারা পরিবর্তনের পরামর্শ কমিউনিটি পর্যায়ে নিশ্চিত করা গেলে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব |

টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতে হবে
টিকা মানবজাতির অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ | টিকার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবন রক্ষা পেয়েছে |
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো হলে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন নতুন ভ্যাকসিন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হবে |
একটি শিশুও যেন টিকার বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন |

মানসিক স্বাস্থ্যও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ
বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু | উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে |
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এখনও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সংকোচ বোধ করেন |
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক সমস্যা শনাক্ত ও সমাধান করা সম্ভব হবে |

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী এখনও গ্রামে বসবাস করে | তাদের জন্য শহরের বড় হাসপাতালে যাওয়া অনেক সময় ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য |

সেক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আরও কার্যকর করতে হবে |
স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত হবে |
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সম্ভাবনা
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে |  টেলিমেডিসিন, অনলাইন পরামর্শ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়িয়েছে |

বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ পেতে পারেন |
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে |


জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয় প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতন জনগোষ্ঠী |

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানি পান, হাত ধোয়ার অভ্যাস, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান বর্জনের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে |


প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এই সচেতনতা তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম |


সরকারের পাশাপাশি সমাজের ভূমিকা
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয় | ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে |
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ইতোমধ্যে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ বিতরণ, পুষ্টি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে | এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে হবে |
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বাস্থ্য বিনিয়োগ
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা |
বিশেষ করে SDG3 এর লক্ষ্য হলো সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা | এই লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে |
যদি স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি এবং অসংক্রামক রোগের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে |

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না | প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সুস্থ, কর্মক্ষম এবং নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে |
সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা | কারণ স্বাস্থ্যসেবার প্রথম দরজাই যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে বড় বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পাবে এবং জনগণের স্বাস্থ্যমান উন্নত হবে |
আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্যখাতকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার |


 প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ মানে শুধু চিকিৎসা নয় এটি একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণের বিনিয়োগ |

“সবার জন্য স্বাস্থ্য, সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাবিকাঠি হলো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা।”


লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমকম, এমপিএইচ, বিফার্মা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য)।