ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।
সিলেটে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামসহ ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা বিএনপির নেতাদের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে সিলেটের বিএনপি নেতাদের মূল্যায়নকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে এখনো মূল্যায়নের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন আন্দোলনে সক্রিয় রাজপথের ত্যাগী এবং প্রবাসে দলের পক্ষে কাজ করা অনেক নেতা।
সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিজয় অর্জন করে বিএনপি। নির্বাচিতদের মধ্যে চারজন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং একজন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। সরকার গঠনের পর সিলেট সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) গুরুত্বপূর্ণ পদেও বিএনপির নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে দলের দুঃসময়, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেশ কয়েকজন নেতা এখনো মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের আলোচনায় যাদের নাম বেশি উঠে আসছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সভাপতি নাসিম হোসাইন, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল এবং বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য কামরুল হাসান চৌধুরী শাহিন।
সূত্রে জানা গেছে, তারা সকলেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নিঃশ্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন। এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাতেও তারা দলের নির্দেশ পালন করে গেছেন। শুধু দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরাই নয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাঠিতেও প্রবাসী নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের অনেক প্রবাসী নেতাও এখনো মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছেন। দলীয় সূত্র বলছে, বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতার মধ্য থেকে ভবিষ্যতে বিভিন্ন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা কূটনৈতিক মিশনে যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অপর উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। জাতীয় সংসদে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এম এ মালেক এবং বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী সম্প্রতি সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মনোনীত হলেও মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিটি করপোরেশন প্রশাসক, জেলা পরিষদ প্রশাসক ও সিউকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই এসব দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ধাপে জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে সংগ্রাম করা নেতাকর্মীদের অবদানও কম নয়। পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে আরও ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা দলীয় কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে সিলেটের রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থায় নতুন নিয়োগ ও পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় ত্যাগী ও প্রবাসী নেতাদের কতটা মূল্যায়ন করা হয়। যারা দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্যাতিত, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে থাকা, হামলা-মামলা শিকার এবং কারা নির্যাতিত এইসব নেতারা কি আদৌ মূল্যায়ন পাচ্ছেন বা পাবেন কি-না।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে জামায়াতের। তারা বলছে, ‘সরকার দলীয়করণের পথে হাঁটছে। তারা যদি অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের মতো আচরণ করে, জনগণও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেককেই এখনো মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে সরকার জনকল্যাণমূলক কাজ করলে জামায়াত সহযোগিতা করবে বলেও জানায় জামায়াত।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী জানান, ‘জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপি সবসময় ত্যাগীদের মূল্যায়ন করে এসেছে। সরকার গঠনের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা প্রত্যেককেই পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে।’
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী সিলেটভিউকে বলেন, ‘আমরা দলের উর্ধ্বে নই। দলের সিদ্ধান্তকে আমরা সব সময় প্রাধান্য দেই। দল সবসময় ত্যাগীদের মূল্যায়ন করছে। ইনশাআল্লাহ, আগামীতেও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আসছে। সেখানে দল ত্যাগী ও তৃণমূল নেতৃবৃন্দকে মূল্যায়ন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখনও অনেক সুযোগ বাকী আছে। খুব শীঘ্রই আমার একটা ভালো সুখবর পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।’
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু সিলেটভিউকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত দলের প্রতি সন্তুষ্ট আছি। শুধু এখন না আগামীতেও দল যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা সেটাই মানবো। এবং আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিগত দিনের মাঠ পর্যায়ের তৃণমূল ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবে।’ বাংলাদেশ সরকারের কাছে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটবাসীর জন্য আমার চাওয়া থাকবে, দীর্ঘ ৪০ বছর থেকে পিছিয়ে পড়া উপজেলা জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট। এই দুই উপজেলাকে আধুনিকায়ন ও এখানকার অবহেলিত মানুষের দিকে সরকারের সুদৃষ্টি হয় সেই প্রত্যাশা থাকবে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.