ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।
টানা বৃষ্টিপাত ও উজানের ভারী বর্ষণের প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই। কোথাও কোথাও পানি প্রবেশ করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কমে এলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ সাত দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২১ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের পাশাপাশি ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট অঞ্চলের অধিকাংশ নদী ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সীমান্তের ওপারে ভারী বৃষ্টিপাত হলে তার প্রভাব খুব দ্রুত সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা ও আশপাশের অন্যান্য নদীতে পড়তে শুরু করে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি বা বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নদী দুটির বিভিন্ন পয়েন্টে পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা এবং হাওরাঞ্চলের কিছু অংশে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একই সময়ে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, কংস, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানিও বেড়েছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এসব নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশাসহ হাওরঘেঁষা এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে সতর্কতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উজানে অতিবৃষ্টি হলে দ্রুত নেমে আসা পানিতে নিচু জমি ও গ্রামীণ সড়কগুলো সাময়িকভাবে তলিয়ে যেতে পারে। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোরো ধান ইতোমধ্যে ঘরে তোলা শেষ হওয়ায় কৃষি ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।
অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগর ও এর আশপাশের এলাকায় মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকায় বৃষ্টিবহুল আবহাওয়া বিরাজ করছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী কয়েক দিন সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসেও একই ধরনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৫ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণও হতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বেড়েছে। ফলে বড় ধরনের বন্যা না হলেও আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও স্বল্পমেয়াদি প্লাবন বর্ষা মৌসুমের একটি নিয়মিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে নদীতীরবর্তী ও হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বশেষ আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক নয়। তবে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং উজানের অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে। কারণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানিপ্রবাহ অনেকটাই সীমান্তের ওপারের বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পূর্বাভাস অনুযায়ী ভারী বর্ষণ হলে স্থানীয়ভাবে পানি বৃদ্ধির পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.