প্রকাশিত: ১৮ জুন, ২০২৬ ১৩:০২ (বৃহস্পতিবার)
ঢাকার মঞ্চে আজ সিলেটের ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত ‘নতুন নাটকের উৎসব-২০২৬’-এ আজ মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে সিলেটের নাট্যসংগঠন নাট্যায়ন সিলেটের বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত নাট্যপ্রযোজনা ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় নাটকটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত বছর মঞ্চস্থ হওয়া নতুন নাটকগুলোর মধ্য থেকে বাছাই করে উৎসবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাত্র আটটি নাটক। সেই নির্বাচিত প্রযোজনাগুলোর অন্যতম হিসেবে স্থান পেয়েছে নাট্যায়ন সিলেটের ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র নাটক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ের এই উৎসবে অংশগ্রহণ নাট্যায়ন সিলেটের জন্য যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তেমনি সিলেটের সামগ্রিক নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যও এটি গৌরবের বিষয় বলে মনে করছেন নাট্যকর্মীরা।

নন্দিত নাট্যব্যক্তিত্ব মোস্তাক আহমেদের নির্দেশনায় এবং নাট্যকার এখলাছ আহমেদ তন্ময়ের রচনায় নির্মিত নাটকটি ইতোমধ্যে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চায়নের মাধ্যমে দর্শক ও নাট্যসমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নাটকের বিষয়বস্তু, মঞ্চ-উপস্থাপনা, আলোক পরিকল্পনা এবং প্রতীকধর্মী নাট্যভাষা দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ মূলত জীবন, মৃত্যু, হতাশা, অনুশোচনা এবং মানবিক উপলব্ধির এক দার্শনিক অনুসন্ধান। নাটকটির কাহিনিতে দেখা যায়, আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবন শেষ করা কয়েকজন মানুষ মৃত্যুর পর এসে উপস্থিত হয় এক অদ্ভুত ও রহস্যময় জগতে। এটি এমন এক স্থান, যেখানে জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা অস্পষ্ট। সেখানে তারা নিজেদের অতীত, সিদ্ধান্ত এবং অপূর্ণতার মুখোমুখি হয়। ধীরে ধীরে তাদের উপলব্ধি হতে থাকে জীবনের প্রকৃত অর্থ, মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব এবং বেঁচে থাকার অপরিসীম মূল্য।

নাটকের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘মেসেঞ্জার’ তাদের সামনে জীবনের নানা সত্য উন্মোচন করে। তার মাধ্যমে নাটকটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয় একটি শক্তিশালী বার্তা—জীবনে যত প্রতিকূলতাই আসুক না কেন, আত্মসমর্পণ নয়; বরং সাহস, ধৈর্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে। হতাশা কিংবা ক্ষণিকের আবেগ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; বরং জীবনই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।

নির্দেশক মোস্তাক আহমেদ নাটকটিতে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক কল্পলোককে ইল্যুশনধর্মী মঞ্চভাষার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। আলোকসজ্জা, প্রক্ষেপণ, আবহসঙ্গীত এবং প্রতীকী দৃশ্য বিন্যাসের সমন্বয়ে দর্শকদের জন্য এক ভিন্নধর্মী নাট্য-অভিজ্ঞতা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। নাট্যকার এখলাছ আহমেদ তন্ময়ের ভাষায়, “দুঃখ, কষ্ট ও হতাশা মানুষের জীবনেরই অংশ। কিন্তু সংকটের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং তাকে মোকাবিলা করাই মানুষের সহজাত ধর্ম। মানুষ তার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জীবনের অর্থ খুঁজে পায়।”

নাটকটিতে অভিনয় করেছেন মোস্তাক আহমেদ, এখলাছ আহমেদ তন্ময়, রীমা দাস, শিপন আহমদ, রুবেল আহমেদ রাজ, রিংকু মালাকার, এনামুল হক সামি, পারভেজ আহমেদ এবং মো. সাদমান তন্ময় আদিয়ান। তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে নাটকের দার্শনিক ও মানবিক বার্তাগুলো দর্শকের কাছে প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রযোজনাটির নেপথ্যে সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন নজরুল ইসলাম মনজুর ও তুহিন খান। মঞ্চ ও পোশাক পরিকল্পনা করেছেন মোস্তাক আহমেদ। আলোক পরিকল্পনায় রয়েছেন খোয়াজ রহিম সবুজ, প্রক্ষেপণে বদরুল আলম এবং আবহসঙ্গীত পরিকল্পনা ও প্রয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন রীমা দাস ও উত্তম কাব্য।

নাট্যায়ন সিলেটের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, জাতীয় পর্যায়ের এ ধরনের উৎসবে অংশগ্রহণ শুধু একটি নাট্যদলের সাফল্য নয়; বরং এটি সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় পরিসরে আরও দৃশ্যমান করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাঁদের প্রত্যাশা, ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ দর্শকদের বিনোদনের পাশাপাশি জীবনের প্রতি নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং হতাশার বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে।

জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানবিক মূল্যবোধ, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রত্যয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ সমকালীন সমাজের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। নাট্যায়ন সিলেটের পক্ষ থেকে নাট্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন দর্শকদের আজকের প্রদর্শনী উপভোগের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাকিল/পিটি