প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬ ০০:০০ (শুক্রবার)
ট্রাভেল পাস পেলেও ভারত থেকে ফিরতে পারছেন না সিলেটের জাকির

ছবি: সিলেট ভিউ।

পাঁচবছর আগে বাড়ি থেকে সকালে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়া সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার মানসিক প্রতিবন্ধী যুবকের সন্ধান মিলেছে ভারতের একটি কারাগারে। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের শিলচরের একটি মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে খোঁজ মিলে তার। পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে সীমান্তে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারার কারণে নতুন করে হতাশায় পড়েছে পরিবার।

 

নিখোঁজ হওয়া ওই যুবক মো. জাকির হোসেন (৩৪)। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ৯ নম্বর সুরমা-কালিকাপুর ইউনিয়নের আব্দুল মন্নানের ছেলে এবং সে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে জানা গেছে। 

 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিদিনের মতো সকালে জাকির বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। এরপর আমরা আত্মীয়স্বজনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজাখুঁজি করি। দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালিয়েও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় একসময় আমরা প্রায় আশাই ছেড়ে দিই। পরবর্তীতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে একটি মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে জানতে পারি যে, জাকির হোসেন ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় তার ট্রাভেল পারমিট (টিপি) সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়।

 

জাকিরের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গুয়াহাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন তাকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে তিন মাস মেয়াদি একটি ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে। এতে উল্লেখ করা হয়, শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা জাকির হোসেনের সাজার মেয়াদ গত ৮ মে শেষ হয়েছে এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

 

পরিবারের অভিযোগ, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে জাকির হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুতারকান্দি সীমান্তে নিয়ে আসে। কিন্তু সেখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাকে গ্রহণ না করায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে পুনরায় শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যায়।

 

তবে এ বিষয়ে পাওয়া একটি সরকারি চিঠিতে দেখা যায়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে গত ৩১ মে নির্ধারিত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং নতুন তারিখ পরে জানানো হবে বলে বিএসএফকে অবহিত করে।

 

জাকিরের পিতা আব্দুল মন্নান জানান, মো. জাকির হোসেন মাদরাসার ছাত্র ছিলেন এবং দাখিল পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। আমাদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। পরিবারের অভাব-অনটন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে জাকির সবসময় মানসিক চাপে থাকতেন। একপর্যায়ে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো আচরণ করতে শুরু করেন। এতে আমরা পরিবারও গভীর উদ্বেগের মধ্যে পড়ে যাই। ২০২১ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিদিনের মতো সকালে জাকির বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। এরপর আমরা আত্মীয়স্বজনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজাখুঁজি করি। দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালিয়েও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় একসময় আমরা প্রায় আশাই ছেড়ে দিই। পরবর্তীতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে একটি মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে জানতে পারি যে, জাকির হোসেন ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় তার ট্রাভেল পারমিট (টিপি) সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জাকিরকে সীমান্ত পর্যন্ত আনা হলেও শেষ মুহূর্তে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। বিজিবির প্রয়োজনীয় একটি নথি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাকে গ্রহণ করা হয়নি। ফলে সীমান্তে এসেও আমার ছেলে আমার কাছে ফিরে আসতে পারেনি।

 

এদিকে জাকিরের বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদের স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. জাকির হোসেন একজন মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

 

মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় জাকির হোসেন না বুঝেই দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতে চলে যান। বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় ভারতীয় পুলিশ তাকে আটক করে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি শিলচর কারাগারে রয়েছেন। পরে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘জাকির হোসেনকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর সুপারিশ করেছি। কিন্তু তাকে দেশে আনার উদ্দেশ্যে সুতারকান্দি সীমান্তে নিয়ে আসার পরও স্থানীয় বিজিবি সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেননি।’


এই বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (৫২ বিজিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজন সিলেটভিউকে বলেন, ‘ভারত থেকে কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বিএসএফ কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে তার নাম পাঠালে প্রথমে তার ঠিকানা ও পরিচয় যাচাই করা হয়। এ জন্য পুলিশের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বিজিবি সদরদপ্তরে পাঠানো হয়। সদরদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর ওই ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।’


ট্রাভেল পাস পাওয়ার পরও পরিচয় শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ট্রাভেল পাস, পাসপোর্ট বা ভিসা সংক্রান্ত বিষয়গুলো ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আওতাধীন; এসবের সঙ্গে বিজিবির সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে ভারত থেকে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তার নাম, ঠিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

 

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া