জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সম্পৃক্ততার লক্ষ্যে সিলেটে অনুষ্ঠিত হয়েছে একদিনব্যাপী যুব সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মশালা। “ইয়ুথ ফর জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন (Y-JET): পাওয়ারিং টুমরোজ এনার্জি” শীর্ষক এই কর্মশালাটি ১৭ জুন সুবিদবাজারস্থ একটি ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়।
ইউকান (YOUCAN) এবং পহুস (POHUS)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, যুব সংগঠন, উন্নয়ন সংস্থা এবং পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মীদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর (Just Energy Transition) সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি করা এবং স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এতে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
কর্মশালায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি জিওগ্রাফি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি (মুগাস)-এর প্রতিনিধিদল। তারা দলীয় কার্যক্রম, আলোচনা ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজকরা দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির উপর উচ্চ নির্ভরতা বিদ্যমান। বিশেষ করে গ্রামীণ সেচ ব্যবস্থায় ডিজেলচালিত পাম্পের ব্যবহার, বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা, রুফটপ সোলার এবং বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি সম্ভাবনাময় বিকল্প হলেও বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এর বিস্তার প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
কর্মশালার অন্যতম আকর্ষণ ছিল “লোকাল এনার্জি রিয়েলিটি ম্যাপিং” কার্যক্রম। এতে অংশগ্রহণকারীরা নিজ নিজ এলাকার জ্বালানি ব্যবহার, সমস্যা, নির্ভরতার ধরন এবং উন্নয়নের সম্ভাবনা চিহ্নিত করেন। এই অনুশীলনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের জ্বালানি বাস্তবতার একটি সুস্পষ্ট চিত্র উঠে আসে।
পরবর্তী সেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং সচেতনতার ঘাটতিকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা এবং তরুণ সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
দিনের দ্বিতীয়ার্ধে অনুষ্ঠিত “সোলিউশন ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপ”-এ অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় জ্বালানি সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করেন। এতে সৌরশক্তিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু এবং যুব নেতৃত্বাধীন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সুপারিশ উঠে আসে।
সমাপনী প্যানেল আলোচনায় শিক্ষাবিদ, গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ, জলবায়ু ন্যায়বিচার, তরুণদের ভূমিকা এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশ অপরিহার্য। ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে তরুণদের সক্রিয় ও জ্ঞানভিত্তিক অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে।
কর্মশালা সম্পর্কে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি জিওগ্রাফি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি (মুগাস)-এর সভাপতি ও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের সিনিয়র লেকচারার আহমেদ ইসতিয়াকুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ ও সিএসই বিভাগের লেকচারার ইসরার নাজাহ্ চৌধুরী এবং ছাত্র উপদেষ্টা প্রিতম পাল বলেন, বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তরুণদের জ্ঞানভিত্তিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব ছাড়া ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়।
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান তানভীর এম. ও. রহমান চৌধুরী বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং তরুণদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে যুবসমাজ দেশের জ্বালানি খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
আয়োজকরা জানান, কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই অর্জন করেননি, বরং বাস্তব জ্বালানি সমস্যার বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাবের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন। কর্মশালার সুপারিশ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।
অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে পরিবেশ ও জ্বালানি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.