ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের যে উন্মাদনা তা বিশ্বে বিরল। চার বছর পর-পর পুরো দেশ ভিন্ন-ভিন্ন পতাকায় রঙিন হয়ে যায়। সমর্থকরা নিজ-নিজ সমর্থীতো দেশের পতাকায় সারা দেশ রাঙিয়ে তুলেন। ভিন্ন-ভিন্ন সমর্থকদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা বৈরিতা নয় বরং এক রঙিন উৎসব। সমর্থকরা নিজ দলের জার্সি ও পতাকার রঙে নিজেদের বাড়ি, গাড়ি, এমনকি আস্ত বহুতল ভবনও রাঙিয়ে তোলেন। দেশের আনাচে-কানাচে শত-শত ফুট লম্বা পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো যাদের নিয়ে আমাদের এই তুমুল উন্মাদনা সেই আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের মানুষ কতটুকু জানে বাংলাদেশের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গভীরতা সম্পর্কে? দুর্ভাগ্যবশত লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষ আমাদের এই আবেগের কথা কিছুটা জানলেও, এর ব্যাপকতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। আর এর প্রধান কারণ হলো ভাষাগত দূরত্ব। আমাদের দেশের সমর্থকরা যখন এসব উন্মাদনার ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন তখন ক্যাপশন বা বিবরণ থাকে বাংলা অথবা ইংরেজি ভাষায়। তারা বাংলা এবং ইংরেজি জানে না। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রভাষা স্প্যানিশ এবং ব্রাজিলের পর্তুগিজ। ফলে ভাষার এই দেয়াল টপকে আমাদের আবেগ তাদের মনকে পুরোপুরি ছুঁতে পারে না।
এই সীমাবদ্ধতা স্নত্ত্বেও আমরা দারুণ সুযোগে রূপান্তর করতে পারি। আসন্ন বিশ্বকাপগুলোতে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে তাদের জনপ্রিয় ইউটিউবার, প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সার এবং সাংবাদিকদের বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশে আনতে হবে । তারা যখন এ দেশে এসে সরাসরি সাধারণ মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখবে এবং নিজেদের ভাষায় (স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ) কনটেন্ট তৈরি করে তাদের দেশের মিডিয়ায় প্রচার করবে তখন তৈরি হবে এক নতুন ইতিহাস।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা বহুমাত্রিক সুবিধা পেতে পারি। সম্পর্ক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক মর্যাদা। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ও উৎসবমুখর ছবি ফুটে উঠবে। তৈরি হবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এছাড়াও পর্যটন শিল্প বিকশিত হতে পারে। দুই দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির পথ সুগম হবে। যা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেবে। বিদেশী গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বাংলাদেশে আনার জন্য সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাফুফে (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) যৌথভাবে বা আলাদাভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি দেশের বড়-বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি ব্যক্তিরা যদি স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসে তবে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নিজেদেরও ব্র্যান্ডিং দারুণভাবে সফল হবে।
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয় এটি বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের এই ফুটবল উন্মাদনাকে কেবল ঘরের কোণেই সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক প্রচারের মাধ্যমে বৈশ্বিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এখনই উপযুক্ত সময়। সরকার বাফুফে এবং দেশের কর্পোরেট খাতগুলো যৌথভাবে এগিয়ে এলে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
লেখক: সামিয়া আফরিন, শিক্ষক, একাডেমাস কোচিং হোম, মেজরিটিলা, সিলেট।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.