আর্জেন্টিনার পারানা নদীর তীরঘেঁষা শহর রোজারিও। সেই শান্ত শহরেই ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেয় এক শিশু।মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি বিখ্যাত মার্কিন গায়ক লিওনেল রিচির দারুণ ভক্ত ছিলেন। ফলে গায়কের নামানুসারেই সন্তানের নাম রাখেন ‘লিওনেল’। বাবা হোর্হে মেসি অবশ্য প্রথমে অন্য নাম রাখতে চেয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত মায়ের পছন্দই টিকে যায়।
এছাড়া পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে যোগ হয় আন্দ্রেস ও বাবার নামানুসারে হয় মেসি। ফলে পুরো নাম হয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
আজ সেই রোজারিওর ছেলে ‘ফুটবল জাদুকর’ খ্যাত লিওনেল মেসি ৩৯ বছরে পা রাখলেন। সময়ের হিসেবে এটি একটি দীর্ঘ পথচলা, কিন্তু ফুটবলের ভাষায় এটি এক অসাধারণ মহাকাব্য—যার প্রতিটি অধ্যায় এখনো বিশ্বকে নতুন করে বিস্মিত করে চলেছে।
শৈশবে শারীরিকভাবে দুর্বল থাকলেও ফুটবলের প্রতি মেসির আকর্ষণ ছিল অদম্য। কেউই হয়তো কল্পনা করেনি, ভঙ্গুর শরীরের সেই শিশুই একদিন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠবে।
শুরুটা হয়েছিল রোজারিওর স্থানীয় ক্লাব আবান্দেরাদো গ্রান্দোলিতে। রোজারিও শহরের এই স্থানীয় ক্লাবে মাত্র চার বছর বয়সে (১৯৯১ সালে) মেসির ফুটবল যাত্রা শুরু হয়।
এরপর নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে প্রতিভার ঝলক দেখা যায়। তবে এগারো বছর বয়সে গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা পড়লে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রিভার প্লেট চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ঠিক তখনই সামনে আসে বার্সেলোনা এবং একটি ন্যাপকিনে লেখা চুক্তির মাধ্যমে বদলে যায় ফুটবলের ইতিহাস।
বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর মেসির ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক অনন্য আধিপত্যের গল্পে। ক্লাবটির জার্সিতে তিনি ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেন এবং ৩৫টিরও বেশি শিরোপা জেতেন। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা, যা তাকে ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
তবে এই উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ছিল জাতীয় দলের জটিল অধ্যায়। আর্জেন্টিনার জার্সিতে একের পর এক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হার তাকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরাজয়, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা তাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন। পরে সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিলেও চাপ ও সমালোচনা তার ক্যারিয়ারের অংশ হয়ে থাকে।
২০০৬ বিশ্বকাপে অভিষেকের পর থেকে মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল ওঠানামায় ভরা। ২০১০ সালে গোলশূন্য অভিযান, ২০১৪ সালে ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ, ২০১৮ সালে নতুন করে গড়ে ওঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। সেই টুর্নামেন্টেই মেসি পূর্ণতা পান। ফ্রান্সের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ফাইনালে জয় পেয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন তিনি এবং জেতেন গোল্ডেন বল।
এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার প্রভাব অব্যাহত থাকে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে উন্নীত করেন, যা তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ স্কোরারদের কাতারে আরও দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে।
মেসির ক্যারিয়ার শুধুমাত্র গোল বা শিরোপার গল্প নয়, এটি ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্বের এক পরিসংখ্যানগত বিস্ময়ও। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার অফিসিয়াল ক্যারিয়ারে রয়েছে ১ হাজার ১৫৮ ম্যাচে ৯১৬ গোল এবং ৪১৪ অ্যাসিস্ট। আটবার ব্যালন ডি’অর, ছয়বার গোল্ডেন বুট এবং ৪৮টি শিরোপা তার অর্জনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
মেসির যত অর্জন
আন্তর্জাতিক ট্রফি (আর্জেন্টিনা)
ফিফা বিশ্বকাপ: ১ বার (২০২২); কোপা আমেরিকা: ২ বার (২০২১, ২০২৪); ফিনালিসিমা: ১ বার (২০২২); অলিম্পিক স্বর্ণপদক: ১ বার (২০০৮); অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ: ১ বার (২০০৫)
ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ পুরস্কার
ব্যালন ডি’অর: ৮ বার (রেকর্ড); ফিফা দ্য বেস্ট চ্যাম্পিয়ন: ৩ বার; ইউরোপীয় গোল্ডেন শু: ৬ বার; বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল: ২ বার (২০১৪, ২০২২-একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার জয়ের রেকর্ড); লরেয়াস বিশ্ব ক্রীড়াবিদ পুরস্কার: ২ বার (২০২০, ২০২৩)
ক্লাব ট্রফি (বার্সেলোনা, পিএসজি ও ইন্টার মায়ামি)
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ: ৪ বার; লা লিগা (স্পেন): ১০ বার; লিগ ওয়ান (ফ্রান্স): ২ বার; লিগস কাপ (ইন্টার মায়ামি): ১ বার; ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ: ৩ বার; উয়েফা সুপার কাপ: ৩ বার।
অবিস্মরণীয় কিছু রেকর্ড
এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ গোল: ২০১২ সালে ক্লাব ও দেশের হয়ে রেকর্ড ৯১টি গোল করেন।
বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা: ক্লাবটির হয়ে রেকর্ড ৬৭২টি গোল করেছেন।
লা লিগার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা: স্প্যানিশ লিগে ৪৭৪টি গোল নিয়ে শীর্ষস্থান তার দখলে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ট্রফি: ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দলীয় ট্রফি (৪৫টি) জয়ের বিশ্বরেকর্ড মেসির। এছাড়া ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার ট্রফি জয়ের সংখ্যা ৪৮।
সবশেষে বলতে হয় মাঠের ডান দিক থেকে শুরু করে মাঝমাঠ কিংবা ফলস নাইনের ভূমিকায়—প্রতিটি অবস্থানেই তিনি নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ৩৯ বছরে দাঁড়িয়ে মেসির গল্প কোনো সমাপ্তি নয়, বরং একটি চলমান ইতিহাস। রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলের প্রতিটি পদক্ষেপ এখনো ফুটবল ইতিহাসকে নতুন করে লিখে চলেছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১১
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.