ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স ও এআই।
সিলেটে মহানগরীতে আবারও বেড়ে চলছে অসামাজিক কাজ। নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে বারবার অভিযান পরিচালনা করার পরও বন্ধ হচ্ছে না এই সব অনৈতিক কাজ। সমাজের কিছু সংখ্যক তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, নর-নারীরা অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকেন অহরহ। লাগাতার পুলিশের অভিযান, অভিযুক্তরা আটকের পাশাপাশি জড়িত হোটেল সিলগালা করা হচ্ছে। তারপরও থেমে নেই এরা। এই নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে সিলেটে মোট ১২টি আবাসিক হোটেল সিলগালা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে আবাসিক হোটেলের আড়ালে ব্যাপক অপকর্ম চলছে। বিশেষ করে, বন্দর বাজার, সুরমা পয়েন্ট, তালতলা, শেখঘাট, রিকাবীবাজার, আম্বরখানা, শাহজালাল (রহ.) দরগা গেইট, জিন্দাবাজার, সোবহানীঘাট, নাইওয়রপুল, শিবগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা এলাকার কদমতলী এলাকা, হুমায়ুন রশীদ চত্বর এলাকা, লাউয়াই এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকহারে আবাসিক হোটেল রয়েছে। আর এই আবাসিক হোটেলের আড়ালে চলছে রমরমা দেহ ব্যবসার কার্যক্রম।
জানা গেছে, সিলেটের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে অসামাজিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। প্রায়ই সাদা পোশাকের পাশাপাশি পোশাকদারি পুলিশ এসব হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনৈতিক কাজের দায়ে একাধিক নারী-পুরুষসহ হোটেল কর্তৃপক্ষের লোকজনকে আটক করে। কিন্তু আটকের পর আইনের ফাঁক দিয়ে সহজেই বের হয়ে আসে তারা। পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার অভিযান পরিচালনার পরও হোটেল কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেনি এসব অনৈতিক কাজ।
অভিযোগ রয়েছে- যেসব নারী আটক হন সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষই আদালত থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। এরপর ফের শুরু হয় একইরকম অনৈতিক কাজ। প্রায় অভিযানে দেখা গেছে, প্রশাসনের অভিযানের পর জড়িত হোটেলগুলোকে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কিছু অভিযানে ব্যাপকহারে একাধিক নারী-পুরুষসহ হোটেল কর্তৃপক্ষের লোকজনকে আটক করা হয়। এসময় অনৈতিক কাজের প্রমাণ পেলেই সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলোকেও সিলগালা করে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে আবাসিক হোটেলগুলোতে সিলেটে প্রশাসনের অভিযান কমে যায়। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফের বেপোরোয়া হয়ে উঠে এই চক্রটি।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অভিযানে অসামাজিক কাজের দায়ে নগরীর দুটি হোটেল সিলগালা করে। ওই সময়ে অসামাজিক কাজের দায়ে জড়িত তিন নারী-পুরুষসহ ৬ জনকে আটক করে পুলিশ। সিলগালাকৃত ওই হোটেল দুটি হল, সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন তালতলা এলাকার ‘রহমানিয়া বোডিং’ ও ‘ছাদী গেস্ট হাউজ’।
এর আগে এই বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে মহানগরীর বন্দর বাজার এলাকার ‘তালহা রেস্ট হাউজ’। এপ্রিল মাসে লালবাজার এলাকার ‘এলাহী আবাসিক হোটেল’, ‘হোটেল অতিথি’, ‘হোটেল সুফিয়া’। জুন মাসের ২ তারিখে মহানগরীর আম্বরখানা এলাকার ‘নিউ হোটেল লেমন গার্ডেন’ অভিযান চালায় পুলিশ। এইসময় প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। পাশাপাশি জড়িত এই আবাসিক হোটেলগুলোকে সিলগালা করে দেওয়া হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশ ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের ২৪ তারিখ অভিযান চালায় মহানগরীর দক্ষিণ সুরমার ‘সিলেট রেস্ট হাউজ’, তালতলা এলাকার ‘হোটেল বিলাশ’, দক্ষিণ সুরমার ‘গ্রান্ড সাওদা’, ‘আল সাদী হোটেল’। এসময় জড়িতদের আটক করে এবং ওই হোটেলগুলোতে সিলগালা করে প্রশাসন। একই বছরের নভেম্বর মাসে শুরুতে জিন্দাবাজার এলাকার ‘হোটেল রাজমনী’-তে অভিযান চালিয়ে ৩ জনকে আটক করে। অভিযানে পর হোটেল রাজমনীও সিলগালা করা হয়। অন্যদিকে একই বছরের জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখে মহানগরীর আম্বরখানা এলাকার ‘হোটেল নূরানী’ ও ‘হোটেল আলীবাবা’ অভিযান দেয় পুলিশ। এসময় অনৈতিক কাজের জন্য জড়িত ৪জন আটক করা হয়।
তোপখানা এলাকার সায়হাম আহমদ তপু বলেন, ‘প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। শুধু আটক করলেই হবে না, যারা বারবার একই অপরাধে জড়িত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জিন্দাবাজার এলাকার ইউসুফ আলী ঝিনুক বলেন, ‘পরিবার নিয়ে শহরে চলাফেরা করতে গেলে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবাসিক হোটেলগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।’
চৌহাট্টা এলাকার একেএম হাসান বলেন, ‘আমাদের সিলেটে এই ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজের নৈতিক অবক্ষয় বাড়াচ্ছে। প্রশাসনের উচিৎ হোটেল মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘সিলেট মহানগরীতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড রোধে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বদা সচেষ্ট। নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে জড়িতদের আটক করা হচ্ছে। পাশাপাশি জড়িত হোটেলগুলোকেও সিলগালা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট মহানগরীর পোশাকদারি পুলিশের পাশাপাশি আমাদের গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা পেলে পবিত্র এই শাহজালাল (রহ.) এর মাটি থেকে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’
উল্লেখ্য, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার হিসেবে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পরই নগরীর আবাসিক হোটেল মালিকদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় তিনি হোটেলগুলোকে সকল ধরনের অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডমুক্ত রাখার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেন এবং আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান। তবে পুলিশের এই নির্দেশনাকে গুরুত্ব দেননি কিছু হোটেল মালিক। প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে গোপনে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে একটি চক্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব অপতৎপরতা আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। প্রথমদিকে বিভিন্ন হোটেলে অভিযান চালিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নারী-পুরুষ ও সংশ্লিষ্টদের আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করত পুলিশ। কিন্তু বারবার অভিযানের পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় কঠোর অবস্থানে যায় এসএমপি। ফলে সম্প্রতি কোনো আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিললেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.