প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬ ০০:০০ (সোমবার)
ইতালি পাঠানোর নামে লিবিয়ায় নিয়ে বিক্রি

ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে ১৮ লাখ টাকা নিয়ে লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের এক পরিবারের বিরুদ্ধে। প্রায় চার মাস নির্যাতন, জিম্মিদশা ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়ে অবশেষে দেশে ফিরে এসে বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম (৩৬)।


ভুক্তভোগীর বাড়ি উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের পশ্চিম সাভিয়ানগর দক্ষিণপাড়ায়। একই এলাকার আবুল হোসেন (৬২), তার স্ত্রী আম্বিয়া বেগম (৫০), বড় ছেলে কাদির মিয়া ও ছোট ছেলে আকাঈদ মিয়াসহ সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবপাচার, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন তিনি।
 

রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ও তার ছোট ভাই স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি বাড়িতে গোয়ালঘর ভর্তি গোবাদিপশুর দেখাশোনা করতেন। বাড়ির কাছে আত্মীয় হওয়ায় কাজের ফাঁকে আড্ডা দিতেন আবুল হোসেন ও তার স্ত্রী আম্বিয়া বেগমের সঙ্গে। তারা প্রায় সময় রফিকুল ইসলামকে ইতালিতে যাওয়ার জন্য উৎসাহ উদ্দীপনা দিতেন। এক সময় উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হন। অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় সহজেই বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রথমে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে ১৮ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। এর মধ্যে ৯ লাখ টাকা আগে এবং বাকি ৯ লাখ ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর আমাকে ঢাকায় নিয়ে ১৭ দিন বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা থেকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।’
 

রফিকুল আরও জানান, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ছিলেন, যাদের অধিকাংশকেই পরে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাকে আলাদা করে রেখে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তাকে মরুভূমির মধ্যে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা তাকে মারধর করে এবং পরিবারের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনার কথা জানায়।

তারা দাবি করে, তাকে ইতোমধ্যে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
 

রফিকুলের অভিযোগ, প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ দিন তিনি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। খাবারের সংকট, শারীরিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকির মধ্যে দিন কাটাতে হয় তাকে। একপর্যায়ে সুযোগ পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরে তাকে চিকিৎসা দিয়ে একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়।

আত্মীয়ের সহযোগিতায় দেশে ফেরা নিয়ে রফিকুল জানান, তার শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় স্থানীয় আইনজীবীর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
 

তার দাবি, বিদেশে থাকা অবস্থায় অভিযুক্তরা পরিবারের সদস্যদের বারবার টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দিতেন এবং ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতেন।

রফিকুল জানান, দেশে ফেরার পরও তিনি দীর্ঘদিন অভিযোগ করতে সাহস পাননি। কারণ বিদেশে থাকা অভিযুক্ত আকাঈদ মিয়া তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেন। এমনকি বিষয়টি প্রকাশ করলে তাকে গুম করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বাস করে আত্মীয়স্বজনের হাতে নিজের জীবন তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই, যাতে আর কোনো মানুষ এমন প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার না হয়।’
 

এই নিয়ে রফিকুলের স্ত্রী ডলি সুলতানা পুনম অষ্টগ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে অভিযুক্তরা মোট ১৮ লাখ টাকা নেন। পরে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে একটি মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দেশে ফিরতে পরিবারকে আরও প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তরা তা মানেননি। বরং বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন।

অভিযোগে সংযুক্ত ব্যাংক রশিদ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা হিসাবে ৪ লাখ টাকা, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর আরও ৪ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি সবুজা বেগম নামে একটি হিসাবে ৭ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এসব লেনদেনের নথি অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়েছে বলে পরিবার দাবি করেছেন।
 

দেওঘর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. বাবুল আহমেদ বলেন, ‘রফিকুল অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ। বিদেশ যাওয়ার আগে সে কাউকে কিছু জানায়নি। পরে জানতে পারি, এলাকার কয়েকজনের মাধ্যমে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। দেশে ফেরার পর তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল।’

রফিকুলের বন্ধু আহমেদ রেজা জানান, দেশে ফেরার পর রফিকুলের বর্ণনা শুনে তিনি একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ ও হুমকির মুখে ভিডিওটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হই।
 

অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান বলেন, ‘একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে অন্য পথে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তিনি একটি মানবপাচারকারী ও মাফিয়া চক্রের কবলে পড়েন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৩