পরীক্ষা কেবল তিন ঘণ্টার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয় বরং এটি একটি শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, ত্যাগ এবং হাজারো স্বপ্নের এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র | আর এই যুদ্ধক্ষেত্রের এক নীরব, অতন্দ্র প্রহরী হলেন কক্ষ পরিদর্শক |
প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার আগমনী ঘণ্টা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়ে আসে এক ভিন্ন আবহ—যেখানে একদিকে থাকে তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে আগামীর স্বপ্ন আর মুখে চাপা উদ্বেগ, অন্যদিকে থাকে অভিভাবকদের বুকভরা উৎকণ্ঠা | এই চেনা দৃশ্যের অন্তরালে থেকে একজন শিক্ষক বা কক্ষ পরিদর্শক যেভাবে পরীক্ষার হলটিকে অবলোকন করেন, তা কেবল নিয়মের বেড়াজালে বন্দি কোনো দায়িত্ব নয়, বরং সততা ও মানবিক মূল্যবোধের এক নীরব পাঠশালা |
একজন হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে জীবনের জমাখরচের খাতার চেয়েও পরীক্ষার হলের এই মানবিক ও নৈতিক হিসাব-নিকাশ আমাকে গভীরভাবে তাড়িত করে | সেই তাড়না এবং এক দশকের অভিজ্ঞতার আলোকেই এই দিনলিপি যা কেবল একজন পরিদর্শকের দায়িত্ব পালনের বিবরণ নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থী ও সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখার এক জীবন্ত দলিল |
১. ভোরের আলো এবং একটি উৎসবমুখর উৎকণ্ঠা
সকালের সূর্যটা তখনো পুরোপুরি তার তীব্রতা ছড়াতে পারেনি | সিলেটের হালকা সকালের হাওয়া কেটে যখন পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে এসে দাঁড়াই, তখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা | কিন্তু কেন্দ্রের সামনের চাদর বিছানো রাস্তা আর প্রধান ফটকের দৃশ্য দেখলে মনে হবে, এক বিশাল জনসমুদ্র এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে |
প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার এই দিনগুলোতে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে এক অদ্ভুত, মিশ্র পরিবেশের সৃষ্টি হয় | একদিকে এটি উৎসবমুখর, অন্যদিকে চরম উৎকণ্ঠায় ঘেরা | দূর থেকে তাকালে চোখে পড়ে সাদা আর নীল রঙের স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরা শত শত চঞ্চল কিশোর-কিশোরী। কারও হাতে শেষ মুহূর্তের উল্টেপাল্টে দেখা সাজেশন খাতা, কারও চোখেমুখে শেষ রাতের নির্ঘুম ক্লান্তির ছাপ, আবার কারও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আত্মবিশ্বাসের হাসি | সবার হাতেই সযত্নে ধরা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ ফাইল, যার ভেতর উঁকি দিচ্ছে প্রবেশপত্র (Admit Card), রেজিস্ট্রেশন কার্ড, গোটাচারেক কলম |
গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের চোখে-মুখে যে ব্যাকুলতা, তা কেবল একজন মা বা বাবাই ধারণ করতে পারেন | কেউ সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছেন, কেউ পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলছেন, "ঠাণ্ডা মাথায় লিখিস", আবার কেউ দূর থেকে শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজের স্বপ্নের দিকে | ভেতরের বারান্দায় পা রাখতেই কানে আসে শিক্ষকদের জুতো আর ব্যস্ত পায়ের শব্দ | নোটিশ বোর্ডে সিট প্ল্যান দেখার জন্য শিক্ষার্থীদের মৃদু ধাক্কাধাক্কি, আর অফিস কক্ষে কেন্দ্র সচিব ও পরিদর্শকদের গম্ভীর আলোচনা |
প্রতি বছর, প্রতি পরীক্ষার সকালে এই একই দৃশ্য আমাকে নতুন করে এক গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে | এই পরীক্ষা কেবল আড়াই বা তিন ঘণ্টার একটি আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন নয় | এটি আসলে একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করার, হাজারো পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের এবং তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নযাত্রার এক মহোৎসব ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র |
২. পরিদর্শকের ভূমিকা : শুধু পাহারাদার নাকি এক নীরব অঙ্গীকার ?
আমি নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শকের (Invigilator) দায়িত্ব পালন করে আসছি | নিজে হিসাববিজ্ঞানের একজন ছাত্র এবং একটি বেসরকারি কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষক হওয়ার সুবাদে শিক্ষা ব্যবস্থার একদম তৃণমূল স্তর থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে |
আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষের একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, পরীক্ষার হলের গার্ড বা কক্ষ পরিদর্শকের কাজ খুবই সহজ এবং একঘেয়ে | অনেকে মনে করেন, তাদের একমাত্র দায়িত্ব হলো হলরুমে চেয়ারে বসে থাকা আর কেউ 'নকল' করছে কি না তা পাহারা দেওয়া | অর্থাৎ, শিক্ষকের ভূমিকা যেন এখানে একজন কঠোর পুলিশ বা পাহারাদারের মতো |
কিন্তু আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলে, এই ধারণাটি শুধু ভুলই নয়, বরং একজন শিক্ষকের মর্যাদার পরিপন্থী | আমার কাছে কক্ষ পরিদর্শকের ভূমিকা শুধু পরীক্ষার শৃঙ্খলা বা নীরবতা বজায় রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় | এটি মূলত সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার এক পরম নীরব অঙ্গীকার |
পরীক্ষার ওই নির্দিষ্ট তিন ঘণ্টায় একটি হলের ভেতরের ৩০ বা ৪০ জন পরীক্ষার্থীর সম্পূর্ণ মানসিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে শিক্ষকের ওপর | একজন পরিদর্শকের সামান্য একটু অমনোযোগ, একটি রুক্ষ মন্তব্য কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফলাফলকে ধ্বংস করে দিতে পারে | তাই এই দায়িত্বটি পালনের সময় আমি নিজেকে কেবল একজন পরিদর্শক ভাবি না, বরং নিজেকে একজন অভিভাবক এবং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে কল্পনা করি |
৩. ঘণ্টা বাজার মুহূর্ত ও হলের ভেতরের নৈশব্দ্য
সকাল পৌনে দশটা | দ্বিতীয় ঘণ্টার শব্দ হতেই পরীক্ষার্থীরা নিজ নিজ আসনে গিয়ে বসে পড়েছে | উত্তরপত্র (OMR Sheet) বিতরণের সময় ঘনিয়ে আসছে | আমি এবং আমার সহ-পরিদর্শক খাম সিলগালা করা প্রশ্নপত্র এবং উত্তরপত্রের বান্ডিল নিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করলাম |
রুমে ঢোকার সাথে সাথেই এক ডজন জোড়া চোখ আমাদের দিকে নিবদ্ধ হলো | এই চোখগুলোর ভাষা পড়া অত্যন্ত চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা | কোনো চোখে তীব্র কৌতূহল—"প্রশ্ন কেমন কঠিন হবে?" কোনো চোখে ভয়, আবার কোনো চোখে এক ধরণের উদাসীনতা | আমরা যখন ডেস্কে খাতাগুলো রাখি, তখন পুরো কক্ষে এক ধরণের ভারী নীরবতা নেমে আসে $
ঠিক সকাল দশটায় যখন চূড়ান্ত ঘণ্টাটি বেজে ওঠে, তখন মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে যায় | কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছিল ফিসফিসানি আর চাপা গুঞ্জন, সেখানে স্থান করে নেয় কলমের এক টানা খসখস শব্দ আর খাতার পাতা ওল্টানোর আওয়াজ |
আমি হলের ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে যখন পুরো কক্ষটির দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয়, এই নীরবতার মাঝেও এক বিশাল কোলাহল লুকিয়ে আছে | এটি স্বপ্নের কোলাহল | কেউ খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই দ্রুত গতিতে লিখে চলেছে—তার কলম থামার নাম নেই | কেউ প্রশ্নপত্রটি দুই হাতে ধরে বারবার মনোযোগ দিয়ে পড়ছে, কপালের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে, হয়তো চেনা কোনো প্রশ্নের উত্তর মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে | আবার কেউ একটু সময় নিয়ে, শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজের ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে |
এই নীরবতার মাঝেই আমি যেন শুনতে পাই হাজারো শিক্ষার্থীর বিনিদ্র রজনীর ক্লান্তি, তাদের বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের ত্যাগ এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তাদের নীরব হাহাকার ও লড়াইয়ের শব্দ |
৪. খাতার ভেতরের হিসাববিজ্ঞান এবং জীবনের হিসাব
আমি যেহেতু হিসাববিজ্ঞানের (Accounting) ছাত্র এবং শিক্ষক, তাই পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের খাতা লেখার ধরণ বা মানসিকতা দেখে আমি প্রায়ই জীবনের হিসাব-নিকাশের সাথে এর মিল খুঁজে পাই | হিসাববিজ্ঞানের একটি অন্যতম মূল ভিত্তি হলো 'ডেবিট' এবং 'ক্রেডিট'-এর সমতা আনা | বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীরা লেনদেনের হিসাব মেলাতে গিয়ে খাতার পাতায় দাগ টানে, ব্যালেন্স শিট তৈরি করে |
পরীক্ষার হলটিও কিন্তু এক ধরণের 'ব্যালেন্স শিট' মেলানোর জায়গা | একজন শিক্ষার্থী সারা বছর কতটা পরিশ্রম করেছে, কতটা সময় পড়াশোনায় বিনিয়োগ (Investment) করেছে, আজ এই পরীক্ষার খাতায় সে তারই সম্পদ (Asset) ও দায় (Liability)-এর হিসাব মেলাচ্ছে |
তবে তফাতটা হলো, হিসাববিজ্ঞানের ভুল হলে তা ইরেজার দিয়ে মুছে বা নতুন করে জার্নাল এন্ট্রি দিয়ে সংশোধন করা যায়, কিন্তু জীবনের এই পরীক্ষার খাতায় প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত চূড়ান্ত | অনেক সময় দেখা যায়, একটি মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে জানা প্রশ্নও ছেড়ে দিয়ে আসে | ঠিক যেমন বাস্তব জীবনে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে অনেক বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় |
৫. নিয়মের কঠোরতা বনাম মানবিকতার মেলবন্ধন
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষার নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোর, এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক | পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জাতীয় মানদণ্ড বজায় রাখতে এই কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই | পরীক্ষার্থীদের পরিচয় নিশ্চিত করা, রেজিস্ট্রেশন নম্বরের বৃত্তগুলো সঠিকভাবে ভরাট হয়েছে কি না তা যাচাই করা, অতিরিক্ত উত্তরপত্র বা লুজ শিটের নম্বর মূল খাতায় সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা—এসবই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করতে হয় |
বাস্তবে এই দায়িত্বগুলো পালন করা যতটা যান্ত্রিক মনে হয়, ততটা যান্ত্রিক আসলে নয় | দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতি বছরই আমাকে বিভিন্ন ধরণের বিচিত্র ও আবেগঘন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় |
একবারের ঘটনা খুব মনে পড়ে | পরীক্ষার তখন মাত্র আধঘণ্টা বাকি | হঠাৎ একটি মেয়ে পরীক্ষার্থী খাতা লিখতে লিখতে কলম থামিয়ে দিল এবং তার মাথা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল | আমি দ্রুত তার বেঞ্চের পাশে গেলাম | দেখলাম, মেয়েটি প্রচণ্ড মানসিক চাপে এবং ভয়ে কাঁপছে, তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে | সে নার্ভাস ব্রেকডাউন (Navigational Panic)-এর শিকার হয়েছিল |
>আমি যদি তখন একজন কঠোর পরিদর্শক হয়ে তাকে ধমক দিতাম বা বলতাম "কান্নাকাটি বন্ধ করে লেখো, সময় নেই", তাহলে হয়তো মেয়েটি আর ওই পরীক্ষায় অংশই নিতে পারত না | আমি তা না করে, তার মাথায় হাত রাখলাম | খুব নিচু স্বরে বললাম, "কোনো সমস্যা নেই মা | একটু পানি খাও | এখনো অনেক সময় আছে | তুমি যা পারো, সেটুকুই শান্ত হয়ে লেখো |" আমার সহ-কর্মী শিক্ষক তাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলেন |
মিনিট পাঁচেক পর মেয়েটি নিজেকে সামলে নিল এবং পুনরায় লিখতে শুরু করল | পরীক্ষা শেষে হল থেকে বের হওয়ার সময় সে যখন আমার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার এক চিলতে হাসি দিল, তখন আমার মনে হলো, একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব সফল হয়েছে |
কক্ষ পরিদর্শকের সামান্য অসতর্কতা বা রুক্ষতা যেমন পরীক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে, তেমনি তার একটি শান্ত হাসি, একটি ভদ্র ও ইতিবাচক নির্দেশনা কিংবা সহানুভূতিশীল আচরণ একজন দিকভ্রান্ত বা উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীর মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে | তাই আমি বিশ্বাস করি, পরীক্ষার হলে নিয়মের কঠোরতা যেমন ১০০ ভাগ বজায় রাখতে হবে, তেমনি মানবিকতার দরজাটিও খোলা রাখতে হবে |
৬. সততা ও মূল্যবোধের বাস্তব পরীক্ষাগার
অনেকেই মনে করেন, শিক্ষা কেবল ভালো জিপিএ (GPA) অর্জন করা, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিংবা একটি উচ্চবেতনের চাকরি পাওয়ার হাতিয়ার | কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সব সময় বিশ্বাস করি, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষকে সৎ, দায়িত্বশীল, বিবেকবান এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা |
আর পরীক্ষার হল হলো সেই তাত্ত্বিক শিক্ষার এক বাস্তব পরীক্ষাগার বা লিটমাস টেস্ট | সারা বছর পাঠ্যবইয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সততা ও নৈতিকতার যে শিক্ষা দিই, পরীক্ষার হলে তারা সেটির মুখোমুখি দাঁড়ায় |
যখন একজন শিক্ষার্থী কোনো প্রশ্নের উত্তর ভুলে যায় এবং তার সামনের বা পাশের সহপাঠীর খাতাটি তার খুব নাগালের মধ্যে থাকে, তখন তার মনের ভেতর এক তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় | সেকি অসদুপায় অবলম্বন করে সাময়িক সুবিধা নেবে, নাকি নিজের সততা বজায় রেখে কম নম্বরের ঝুঁকি নেবে ?
এই মুহূর্তে একজন কক্ষ পরিদর্শকের উপস্থিতি এবং তার দৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে | আমি যখন হলের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাই, তখন কোনো পরীক্ষার্থী যদি অসৎ উপায়ের চেষ্টা করে, আমি সাধারণত তাকে প্রথমবারে সরাসরি শাস্তি বা খাতা কেড়ে নিই না | বরং তার পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি, অথবা তার চোখের দিকে তাকাই | আমার চোখের সেই চাউনিতেই সে বুঝে নেয় যে, সে যা করছে তা ভুল এবং শিক্ষকের চোখে তা ধরা পড়ে গেছে |
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে নিজের খাতায় মনোযোগ দেয় | একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের মেধা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ওপর ভরসা করে উত্তর লেখে—তা সে কম হোক বা বেশি—তখন সে শুধু একটি একাডেমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, বরং সে নিজের ভেতরের অনৈতিকতাকে জয় করে নিজের চরিত্রও গড়ে তুলছে | এই চরিত্র গঠনই শিক্ষার প্রকৃত সফলতা |
৭. আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক চাপের স্বরূপ
বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে | এই চাপ বহুমাত্রিক—পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদা, জিপিএ-৫ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা এবং পরবর্তীতে ভালো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার যুদ্ধ |
এই জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের শৈশব ও কৈশোরের স্বাভাবিক আনন্দকে কেড়ে নেয় | পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, এই তীব্র প্রতিযোগিতা কীভাবে কিশোর মনগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে | অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, পরীক্ষার আগের রাতে অতিরিক্ত পড়ার কারণে বা উত্তেজনায় ঘুমাতে না পেরে পরীক্ষার হলে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে |
আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কিন্তু জন্মগতভাবে অসৎ বা ফাঁকিবাজ নয় | তারা মূলত পরিস্থিতির শিকার | তারা সমাজ ও পরিবারের তৈরি করা এক অদৃশ্য ইঁদুর-দৌড়ের (Rat Race) শিকার | তারা শুধু একটি নিরপেক্ষ, শান্ত এবং ভীতিহীন পরিবেশ চায়, যেখানে তারা তাদের সারা বছরের কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন পেতে পারে |
তাই আমাদের মতো পরিদর্শকদের দায়িত্ব হলো হলের ভেতরের পরিবেশটাকে এমনভাবে ধরে রাখা, যেন পরীক্ষার্থীরা অন্তত ওই নির্দিষ্ট স্থানটিকে কোনো ফাঁসির মঞ্চ মনে না করে, বরং নিজেদের মেধা প্রকাশের একটি উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে পারে |
৮. অভিভাবকদের প্রতি আকুল
আবেদন
কক্ষ পরিদর্শকের দিনলিপিতে অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে কিছু না লিখলে এই অভিজ্ঞতা অধরাই থেকে যাবে | পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মা-বাবার মুখের দিকে তাকালে যেমন শ্রদ্ধা জাগে, তেমনি মাঝে মাঝে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয় |
অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তানের মেধা বা ইচ্ছার চেয়ে নিজের সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে বেশি গুরুত্ব দেন | "অমুকের ছেলে গোল্ডেন এ+ পেয়েছে, তোমাকেও পেতে হবে"—এই ধরণের তুলনা একটি সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয় |
পরীক্ষার দিনগুলোতে অনেক অভিভাবক কেন্দ্রেরই আশেপাশে ঘোরাঘুরি করেন এবং পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই সন্তান গেট দিয়ে বের হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন, "কয়টা কমন পড়েছে? সব লিখেছিস তো? একটাও বাদ দিসনি তো?"
এই প্রশ্নগুলো পরীক্ষার্থীর ওপর পরবর্তী পরীক্ষার জন্য এক বিশাল মানসিক পাহাড় সমতুল্য চাপ তৈরি করে | পরীক্ষা যেমনই হোক না কেন, সন্তানের পরীক্ষা শেষে তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলা উচিত, "তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ, এতেই আমি খুশি |
একটি পরীক্ষার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই জীবনের শেষ কথা নয় | জীবন অনেক বড়, অনেক বৈচিত্র্যময় | এইচএসসি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না করেও পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করছেন | তাই অভিভাবকদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ—সন্তানকে পড়াশোনায় উৎসাহ দিন, পাশে থাকুন, কিন্তু তাকে আপনার পূরণ না হওয়া স্বপ্নের বোঝাবাহী কোনো যন্ত্র বানাবেন না | আত্মবিশ্বাস, সততা, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে সফল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে |
৯. আগামীর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
প্রতি বছর যখন এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়, তখন আমার মনে এক ধরণের মিশ্র অনুভূতি বা শূন্যতার সৃষ্টি হয় | এক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলা এই যজ্ঞের শেষ দিনে যখন চূড়ান্ত ঘণ্টার আওয়াজটা বাতাসে মিলিয়ে যায়, তখন শিক্ষার্থীরা এক বিশাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হলরুম থেকে বেরিয়ে যায় | বেঞ্চগুলো খালি পড়ে থাকে, মেঝেতে পড়ে থাকে দু-একটি ছিঁড়ে যাওয়া কাগজ বা নষ্ট কলমের ক্যাপ |
আমি যখন সেই শূন্য হলের দিকে তাকাই, তখন আমার ক্লান্তি কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর আশাবাদের সৃষ্টি হয় | প্রতি বছর পরীক্ষার এই দিনগুলোতে হাজারো প্রতিকূলতা, পারিবারিক সংকট, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং মানসিক চাপকে জয় করে যখন এই ছেলেমেয়েগুলোকে নিষ্ঠার সাথে সংগ্রাম করতে দেখি, তখন আমার ভেতরের মানুষটি নতুন করে বাঁচার শক্তি পায় |
আমি এই পরীক্ষার্থীদের চোখের দিকে তাকিয়ে আগামীর বাংলাদেশকে দেখতে পাই | এই তরুণদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দক্ষ হিসাববিজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, দূরদর্শী চিকিৎসক, সৎ রাজনীতিবিদ, সফল উদ্যোক্তা এবং সৃজনশীল বিজ্ঞানী | তারা হয়তো আজ প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সাধারণ পরীক্ষা কেন্দ্রে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু কাল তারা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বমঞ্চে |
একজন কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে, এই তরুণদের স্বপ্নযাত্রার এক নীরব সাক্ষী ও সারথী হতে পারা আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি এবং গর্বের বিষয় |
১০. জীবনের আসল সনদ
পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় | খাতাগুলো সিলগালা করে বোর্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয় | কয়েক মাস পর এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় | কেউ আনন্দে মেতে ওঠে, কেউ বা বিষাদে ডুব দেয় | সমাজ জিপিএ-র হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে |
কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমার খাতার হিসাব একটু ভিন্ন | আমি বিশ্বাস করি, সততা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা এবং পরম ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের যে অমূল্য শিক্ষা একজন শিক্ষার্থী এই পরীক্ষার হলের তীব্র চাপের মুখে অর্জন করে, সেটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং আসল সনদ (Certificate)।
কাগজের তৈরি সনদের লেখাগুলো হয়তো সময়ের সাথে সাথে মলিন হয়ে যেতে পারে, উইপোকা কেটে দিতে পারে কিংবা ফাইলের ভেতরে বন্দি হয়ে থাকতে পারে কিন্তু পরীক্ষার হল থেকে অর্জিত নৈতিকতা ও চরিত্রের দৃঢ়তা মানুষের আমৃত্যু সঙ্গী হয়ে থাকে |
এই গভীর বিশ্বাস এবং আদর্শকে বুকে ধারণ করেই আমি প্রতি বছর অত্যন্ত আনন্দের সাথে পরীক্ষা কক্ষে পরিদর্শক হিসেবে প্রবেশ করি |আমি মনে করি, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং মানবিক পরীক্ষা কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠন করে না, বরং একটি গোটা জাতির ভবিষ্যৎকে আলোকিত, সুউচ্চ এবং মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে | আর সেই আলো ছড়ানোর মিছিলে একজন ক্ষুদ্র কর্মী হতে পারাতেই আমার জীবনের সার্থকতা |
মনজুরুল মা আবুদ: এমকম (হিসাব বিজ্ঞান), এমপি এইচ (স্বাস্থ্য ও পুষ্টি), শিক্ষক | হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ওয়েস্ট পয়েন্ট কলেজ শিবের বাজার সিলেট।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.