অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামকে কেন্দ্র করে আমাদের এই দেশে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য অর্থবহ কবিতা, গান, স্লোগান ও সাংস্কৃতিক সৃষ্টি—যেগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে।
এসব সৃষ্টি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি ছিল না; বরং ছিল মানুষের অধিকার,স্বাধীনতা,ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার সংগ্রামের প্রতীক।ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রচিত গান, কবিতা ও স্লোগান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস যুগিয়েছে এবং নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছে। আজও সেসব সৃষ্টির শব্দ শুনলে হৃদয় আলোড়িত হয়, শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে এবং ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য,বর্তমানে আমরা এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি।দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যেখানে জ্ঞান, যুক্তি, নৈতিকতা ও সভ্যতার চর্চা হওয়ার কথা, সেখানেই অনেক ক্ষেত্রে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক স্লোগানের প্রচলন দেখা যাচ্ছে।মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি,কিন্তু সেই স্বাধীনতার অর্থ কখনোই অশালীনতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহনন হতে পারে না।যখন প্রতিবাদের ভাষা শালীনতা হারায়,তখন সেই প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে একে অপরকে ট্রল করা,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে অনেকেই কটূক্তি ও অবমাননাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়,পুরো সমাজের ভাষা ও সংস্কৃতির মানও ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি জাতির জ্ঞানচর্চা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি।এখানকার শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে বিচারক,আইনজীবী, শিক্ষক, প্রশাসক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, গবেষক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক হিসেবে দেশের নেতৃত্ব দেবেন। তাই যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশেই অশালীনতা, অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষের চর্চা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে তা ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য শুভ বার্তা বহন করে না। একজন শিক্ষার্থীর পরিচয় তার ভাষা, আচরণ, যুক্তিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে যদি আমরা অসভ্যতা, কুরুচি কিংবা বিদ্বেষমূলক আচরণকে নীরবে সমর্থন করি, তাহলে আমরা অজান্তেই সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে উৎসাহিত করি। কোনো অন্যায়ই কেবল নিজের পছন্দের ব্যক্তি বা দলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে বলে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। নৈতিকতার প্রশ্নে আমাদের সবার অবস্থান হওয়া উচিত সমান ও ন্যায়ভিত্তিক।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মতের ভিন্নতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই ভিন্নতাকে শত্রুতায় রূপান্তরিত করা কিংবা অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করা সভ্যতার পরিচয় নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র শেখায়—ভিন্নমতকে সম্মান করতে, যুক্তি দিয়ে উত্তর দিতে এবং সহনশীলতার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিতে। একজন শিক্ষিত মানুষের শক্তি তার ভাষার সৌন্দর্য, যুক্তির দৃঢ়তা এবং চরিত্রের মহত্ত্বে প্রকাশ পায়।
আমরা সবাই একই সমাজে বসবাস করি।এখানেই আমাদের সন্তান, ভাই-বোন এবং আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠবে।তারা আমাদের কাছ থেকেই ভাষা, আচরণ ও মূল্যবোধ শিখবে।তাই আমরা যদি আজ কুরুচি ও বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলি,তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেটিকেই সামাজিক সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করবে।অন্যদিকে আমরা যদি শালীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা,সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি,তবে একটি সুন্দর, সচেতন ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি যেখানে প্রতিবাদ হবে দৃঢ় কিন্তু শালীন, মতভেদ থাকবে কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না, সমালোচনা হবে যুক্তিনির্ভর কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান নয়। অশ্লীলতা, কুরুচি ও ঘৃণার সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে মানবিকতা, সৌজন্য, যুক্তিবোধ ও পারস্পরিক সম্মানকে ধারণ করাই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রত্যয়। কারণ একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নয়, বরং তার নাগরিকদের চরিত্র, সংস্কৃতি, ভাষা ও নৈতিকতার উৎকর্ষের মধ্যেই নিহিত।
লেখক: আরিফ রশিদ (শিক্ষার্থী), আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.