প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০০:০০ (বৃহস্পতিবার)
সিলেটে যে যু*দ্ধে মাঠে পুলিশ

ছবি: এআই।

মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ এই মাদকের জন্য সমাজে বাড়ছে নানা অপরাধ। মারাত্মক্য এই ব্যাধি রুখতে তোড়জোড়ভাবে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। মাদকের বিস্তার রোধে সিলেটে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাদক নির্মূলে জোরালো অভিযান, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

 

জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেটের বড় দুটি মাদকের স্বর্গরাজ্যে অভিযান পরিচালনা করে সিলেট মহানগর পুলিশ। আর এই অভিযানে অর্ধশতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে তারা। এসময় বিপুল পরিমান ইয়াবা বড়ি, গাঁজাসহ নানা রকমের মাদক উদ্ধার করা হয়।

 

গত ২৭ জুন ২০২৬ সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সিলেটের কাষ্টঘর সুইপার কলোনিতে বিশেষ মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। এসময় ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি এই বিশেষ অভিযানে ৯ হাজার ৪০০ পিস  ইয়াবা বড়ি, ৪ কেজি গাঁজা মাদক বিক্রয়লব্ধ নগদ ১ লাখ ৮৬ হাজার ২০৬ টাকা উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানে গ্রেফতারকৃত মধ্যে ছিলেন মো. সেলিম আহমদ (৪৫) একজন কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী। সেলিম সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকার ডিবির হাওর এলাকার মৃত শাহজাহান বাদশার ছেলে। বর্তমানে মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন কাষ্টঘর এলাকার সুইপার কলোনীর নতুন বিল্ডিং-০১ বসবাস করছেন। এই সময় চার কেজি গাঁজাসহ নজরুল ইসলাম (৪৫) ও তপু লাল (২৫)কে গ্রেফতার করা হয়। তারা দুইজন সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালী থানার কাষ্টঘর এলাকার বাসিন্দা।

 

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমার ক্বিন ব্রিজ সংলগ্ন ভার্থখলা এলাকার সুরমা নদীর পারের সুইপার কলোনিতে অভিযানে নামে পুলিশ। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আড়াই শতাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে দুপুর থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শুরু হওয়া ৬ ঘন্টার অভিযানে আটক করা হয় ১৭ জন মাদক কারবারিকে। এসময় জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য এবং মাদক তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম। অভিযান চলাকালে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীর সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

এদিকে ২০২৫ সালের ১২ জুন কোতোয়ালী মডেল থানাধীন কাষ্টঘর সুইপার কলোনিতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সিলেট মহানগর পুলিশ। এসময় ২৫ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় কুখ্যাত এই আস্তানা থেকে ২২০ পিস ইয়াবা বড়ি, ৬৯০ পুড়িয়া গাঁজা, ১৫৮ লিটার দেশীয় চোলাই মদ এবং মাদক বিক্রয়লব্ধ নগদ ৫৭ হাজার ৫০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

 

সূত্র জানায়, সিলেট মহানগরীর বেশ কয়েকটি অপরাধ রাজ্য রয়েছে। এই অপরাধ রাজ্যের মুকুটহীন রাজা বিভিন্ন দাগী অপরাধী। মহানগরীর বন্দর বাজার, ক্বিন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, শেখঘাট, কানিশাইল, আখালিয়ার কয়েকটি এলাকা, তেমুখী, টুকেরবাজার, লাক্কাতুরা চা বাগান এলাকা, উপশহরের কয়েকটি এলাকা, টিলাগড়, শাহপরান (রহ.) এলাকা, দক্ষিণ সুরমা ভার্থখলার সুরমাপারের কয়েকটি এলাকা, লাউয়াই এলাকা, শিববাড়ি এলাকাসহ আরও বেশ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন, মাদক বিক্রি, চুরি-ছিনতাই এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য নিরাপদ স্থান হিসাবে কুখ্যাত। পাশাশাশি এগুলো দাগী অপরাধীদের জন্য নিরাপদ চারণ ভূমিও।

 

জানা যায়, মহানগরীর বন্দর বাজার, ক্বিন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলাসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন, মাদক বিক্রি, চুরি-ছিনতাই এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে চলছে। আর এসব অপরাধ দমনে এবার কঠোর অ্যাকশন শুরু করেছে প্রশাসন। শুরু করেছে মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান। 

 

এদিকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর নির্দেশনায় মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও সচেতন সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাসব্যাপী মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিনই মহানগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীসহ স্থানীয় এলাকাবাসীদের নিয়ে পথসভা ও র‌্যালি পালন করা হচ্ছে।

 

পথসভায় প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাদকের ভয়াবহ সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। 
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ ও সামাজিক প্রতিরোধই মাদক নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ সময় উপস্থিত সকলকে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থেকে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।

 

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘মাদকের বিস্তার রোধে সিলেট মহানগর পুলিশের উদ্যোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ 

 

তিনি আরও বলেন, ‘মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং এ ধরনের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে। ইতোমধ্যে সিলেটের মাদক কেনা-বেচার বিভিন্ন স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় যারা জড়িত রয়েছেন তাদেরও কয়েকটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তালিকায় মাদক ব্যবসায় জড়িত অনেক বড় বড় হোতা রয়েছেন। মহানগর পুলিশ ও গোয়েন্দা (ডিবি) তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’ 

 

প্রসঙ্গত,সোমবার (১৩ জুলাই) মাদক ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মাদক নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে একটি বিল পাশ করেন। জনমত যাচাই, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ এবং সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

 

নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ কেনা, বিক্রি, সরবরাহ, প্রস্তাব, বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ, সহায়তা বা অন্য কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল অ্যাসেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার বা ব্যবহারের চেষ্টা করেও এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

আইনে আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করতে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক হবে না। এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো অপরাধ আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, তবে অপরাধীকে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধ, বিশেষ করে সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ দমনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং ডগ স্কোয়াড গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৫